চিকিৎসকদের টিকিট সংগ্রহের পদ্ধতি আরও সহজ করুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মরিয়া গেল, এমন বাক্যের ইংরেজি ট্রেন্সলেশন করেছেন শিক্ষার্থীরা। পাঠ্যপুস্তকের সুবাদে এই বাক্যটি রীতিমতো একটি প্রবাদবাক্যের মর্যাদা পেয়ে বসে। নানা উপলক্ষে এই প্রবাদবাক্যটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। এই বাক্যাংশে চিকিৎসাভাবে রোগীর মৃত্যুর কথা বলা হলেও এখানে চিকিৎসক আগমনের একটি বার্তা রয়েছে। কিন্তু এখন অবস্থা হয়েছে উল্টো। এখন বাক্যটি এভাবে গঠন করা যেতে পারে- ডাক্তারের কাছে আসিবার আগে রোগী মরিয়া গিয়াছে। ইচ্ছা ও সামর্থ থাকার পরেও ডাক্তারের টিকিট সংগ্রহের পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে এখন রোগীদের জন্য বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। অনেক জটিল রোগী শুধু উপযুক্ত ডাক্তারের সিরিয়াল সংগ্রহ করতে না পারার কারণে চিকিৎসা নিতে সময় ক্ষেপণের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব চিকিৎসকদের নামমূল্য বেশি সেইসব হাতযশওয়ালা চিকিৎসকদের একটি টিকিট জোগার করতে পারা এখন রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের শামিল গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এখানে সপ্তাহান্তে একদিন (শুক্রবার) বিভিন্ন বিষয়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এসে বিভিন্ন চেম্বারে বসে রোগী দেখেন। কয়েকজন ডাক্তারের সিরিয়াল সংগ্রহ করা বেশ কষ্টকর। একদিন বা কয়েকদিন আগে সকাল বেলা লাইন দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে হয় তাঁদের। টিকিট সংগ্রহের সময় থাকে একেবারে সীমিত। অনেকের ক্ষেত্রে টিকিট সংগ্রহের জন্য অগ্রিম ১০০ টাকা দিতে হয়, অনেকের দিতে হয় না। এটি বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হল, মফস্বলের অনেক রোগীই এই সকালবেলা নির্দিষ্ট স্বল্প সময়ের মধ্যে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন না। শুধু টিকিট সংগ্রহের জন্য একদিন তাদেরকে সুনামগঞ্জ এসে অবস্থান করতে হয়। মোবাইল ফোনে টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়নি এইসব নামকরা চিকিৎসকদের সিরিয়াল সংগ্রহের জন্য। সিলেটের অবস্থাও তথৈবচ। একজন ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, জনৈক পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞের সিরিয়াল সংগ্রহ করতে হয় সকাল ৮.০০ থেকে ৮.২০ মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন করে। ওই ভুক্তভোগী বলছিলেন, তিনি একাধারে কয়েকদিন চেষ্টা করেও ওই নির্দিষ্ট সময়টুকুতে সিরিয়াল সংগ্রহের নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে সংযোগ পেতে ব্যর্থ হয়েছেন, অর্থাৎ সকালের ওই ২০ মিনিট সিরিয়াল সংগ্রহের জন্য একযোগে এত মানুষ চেষ্টা শুরু করেন যে লটারি পাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়ায় সংযোগ পাওয়ার বিষয়টি। অনেকে নাকি এক সাথে ৮/১০ টি মোবাইলে সমসংখ্যক ব্যক্তি নিয়ে চেষ্টা শুরু করেন নির্ধারিত নম্বরে সংযোগ পেতে। সিরিয়াল সংগ্রহকারীরা কিন্তু উপযুক্ত (ক্ষেত্র বিশেষে বেশি) টাকা দিয়েই চিকিৎসাসেবা নিবেন। টাকা দিয়ে সেবা পেতে চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো খাতে এত বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয় কিনা আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমাদের অনাধুনিক ও বাণিজ্যচিন্তাপ্রবণ চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থাটি এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীরা এখন কোথায় যাবেন?
চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এখনও আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। একেবারে সাধারণ থেকে জটিল ধরনের সকল রোগীই দেখেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। অথচ আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এভাবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখা হয় না। আমাদের দেশে যদি বিনা রেফারেন্সে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা কোনো রোগী না দেখতেন তাহলে তাঁদের চেম্বারে এত ভিড় জমত না। প্রাথমিক পর্যায়ে সকল রোগীকেই একজন এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। ওই ডাক্তার রোগীর অবস্থা বুঝে প্রয়োজনে তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট পাঠাবেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে, কোনো ডাক্তারই আয়ত্তের বাইরে হলেও রোগী ছাড়তে চান না বলে আরেকটি অভিযোগ প্রচলিত আছে। ফলে সকলেই প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে চান।
টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির এই জায়গাটিকে আরও কী করে আধুনিক, রোগীবান্ধব ও সময়োপযোগী করা যায় এবং সিরিয়াল সংগ্রহের বিষয়টিকে আরও সহজতর করা যায় সে বিষয়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসা-ব্যবস্থাপকদের ভাবা উচিত।