চিকিৎসা খাতকেও নিয়মের মধ্যে আনতে হবে

ক্যাসিনো ইস্যু ও চলমান শুদ্ধি অভিযানের কথা চিকিৎসকদের স্মরণ করিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছেন, রোগীদের সঠিকভাবে সেবা না দেয়াটা এক ধরনের দুর্নীতি। ঢাকায় চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে বুধবার মন্ত্রী এ কথা বলেছেন। বাংলাদেশে যে ক’টি খাত সবচাইতে বেশি দুর্নীতিপ্রবণ চিকিৎসা খাত তার অন্যতম। এখানে দুর্নীতি হয়ে থাকে বহু মাত্রায়। চিকিৎসাখাতে নিয়োজিত এমন কোনো পক্ষ নেই, সে আপনি চিকিৎসকই বলুন অথবা স্বাস্থ্য প্রশাসন, সেবিকা থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয়, ঔষধ উৎপাদনকারী থেকে বিপণনকর্মী; সর্বত্রই অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা আর দুর্নীতির সরব উপস্থিতি। সরকারি হাসপাতালে সেবা নেই আর সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা ক্রয়ের টাকা নেই, এমন এক নিরেট বাস্তবতার মধ্যে আমাদের বসবাস। ফলে সুচিকিৎসাবঞ্চিত রয়েছে দেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী। আমরা এখনও চিকিৎসাসেবাকে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ অথবা নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ করতে পারিনি। যে যেমন ইচ্ছা আচরণ করছে এখানে। এ নিয়ে কথা বললেও বিপদ। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা সংঘবদ্ধতার জোরে সেবা বন্ধ করে দিতে সক্ষম। এরকম এক বাস্তবতায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের কথা চিকিৎসকদের মনে করিয়ে দেন তখন ক্ষীণ হলেও এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। কিন্তু যখন অতীতে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের নানা পর্যায়ের নির্দেশ-পরামর্শকে উপেক্ষা করে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের নিজেদের মর্জি মত চলার কথা মনে হয় তখন একরাশ হতাশা এসে ভর করে। সত্যিকার অর্থেই আমদের সমাজ দেহে এত এত অনিয়ম-দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলা আর দুর্দশার উপস্থিতি সেখানে ভাল কোনো কিছুর আশা করাই এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে জনসাধারণের ট্যাক্সের পয়সায় ডাক্তারি পাস করা চিকিৎসকদের জনগণের প্রতি নেই ন্যূনতম দায়বদ্ধতা। সরকারি আর বেসরকারি চিকিৎসাসেবার কোনো নীতিমালা করা যায়নি। কোন স্তরের চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন সেটি নির্ধারণ করতে যেয়ে নীতিনির্ধারকরা চোখে অন্ধকার দেখছেন। এই দেশে প্রাইভেট চিকিৎসার জায়গাটি সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ স্থান। রোগীরা বুঝতে পারেন না কোন রোগ নিয়ে কোন চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে হবে। সকলেই হন্যে হয়ে বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে ভিড় করছেন। সামান্য মাথা ব্যথা বা পেট ব্যথা হলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে চান সকলে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও এক্ষেত্রে নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে যন্ত্রের মত দিনে শ’ কিংবা তার চাইতেও বেশি রোগীকে প্রাইভেট চেম্বারে পরামর্শ প্রদান করছেন। সাধারণত কোনো রোগীরই প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তিনি সাধারণ একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের কাছে যাবেন। তিনি রোগীর অবস্থা বুঝে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট রোগীকে রেফার করবেন। কিন্তু এরকমটি হচ্ছে না।
ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি ও ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলো চিকিৎসকদের অনৈতিক তৎপরতার দিকে টেনে নিয়ে থাকে। ওই দুই জায়গা থেকে টাকা গ্রহণ করার সংবাদ এখন ওপেন সিক্রেট। এই অনৈতিক যোগসাজসের কারণে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ঔষধ লিখার প্রবণতা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে কোম্পানিগুলো ঔষধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নির্দেশনা অনুসরণ করে কিনা বুঝার উপায় নেই। কিছুদিন পর পর ঔষধের মূল্য বাড়ানো এখন নিয়মিত হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলোতে এখন চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে বহু গুণ। বহু পরিবার রয়েছে যেখানে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে চিকিৎসা ও ঔষধের পিছনে। অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়াধিক্যের কারণে অস্বচ্ছল ব্যক্তিরা পড়েছেন সবচাইতে বেশি বিড়ম্বনায়।
সরকার যখন সুশাসন নিশ্চিত তথা সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে চাচ্ছেন তখন অবশ্যই চিকিৎসা খাতকেও একটি নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা থেকে আমরা এই খাতে নিয়ম প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ শুরু হবে বলে আশা রাখতে চাই।