চির অম্লান থাকবেন তাঁরা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের সম্ভাবনাময় তিন রাজনীতিক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার বখ্ত নেক, জ্যোৎ¯œার কবি মমিনুল মউজদীন ও আয়ুব বখ্ত জগলুল। তাঁদের অকাল মৃত্যু বার বার কাঁদিয়েছে সুনামগঞ্জবাসীকে। এঁরা তিনজনেই পৌরসভার সাবেক মেয়র (পুরাতন চেয়ারম্যান) ছিলেন। তিনজনেই জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হবার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেটি হয়ে ওঠেনি তাঁদের।
মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার বখ্ত নেক। জন্ম ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শহরের আরপিননগরে।  সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। শহরের আরপিননগরের বাসিন্দা হলেও ষোলঘর-হাসননগর এলাকা থেকে কমিশনার পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন নেক। পৌরসভার  চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ইস্তফা দিলে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এই রাজনীতিক। সাধারণের কাছে জনপ্রিয় নেক মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত শহরের সম্প্রীতি রক্ষার চেষ্টা করেছেন।  আরপিননগরের বাসিন্দা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম হোসেন বখ্ত’এবং বেগম নূরজাহান বখ্ত’এর দ্বিতীয় পুত্র অসম সাহসী মনোয়ার বখ্ত নেক তাঁর সাহসিকতার জন্যই শেষ সময়ে শারীরিক কষ্টে ভুগেছেন। ১৯৯৮ সালের ১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের সিটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর ৫ বছর আগে ১৯৯৩ ইংরেজিতে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ কার্যালয়ের আগুন নেভাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলেন এই রাজনীতিক। শরীরের এই ক্ষত মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত ভুগিয়েছে তাঁকে। দেশের চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরামর্শ দিলে তিনি আমেরিকায় গিয়েও চিকিৎসা করিয়েছিলেন, কিন্তু তাতেও পুরোপুরি সুস্থ  না হয়েই চির বিদায় গ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যু শোক এখনো কাঁদায় সুনামগঞ্জবাসীকে।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর স্ত্রী ও এক পুত্রসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান টানা তিন বারের পৌর চেয়ারম্যান জোৎ¯œার কবি মমিনুল মউজদীন। মনোয়ার বখ্ত নেক’র পর তিনিই ছিলেন এই পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি।
মমিনুল মউজদীন মরমী সাধক হাসন রাজার প্রপৌত্র। হাসন রাজার পরিবারে ১৯৫৫ সালের ২৯ আগষ্ট জন্ম নেন প্রয়াত এ কবি। তার বাবা মরহুম দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী, মা সৈয়দা শামসুন্নাহার খাতুন। মমিনুল মউজদীন সুনামগঞ্জবাসীর অতিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ, ত্যাগী ও জনদরদি। ছোট বেলা থেকেই মউজদীন ছিলেন প্রথাবিরোধী, প্রতিবাদী ও প্রচন্ড সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তার বাউল মন প্রকৃতি ও হাওর-বাওরের উদারতায় কবি হয়ে ওঠে ছোট্টকালেই। তাকে সুনামগঞ্জের আধুনিক কাব্য আন্দোলনের পুরোধা সংগঠক হিসাবে বিবেচনা করা হতো। তার বের হওয়া দুটি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘এ শহর ছেড়ে পালাবো কোথায়’ এবং ‘হৃদয় ভাঙ্গার শব্দ’। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে তার কবিতা ছাপা হতো নিয়মিত। ১৯৯৩ সালে মমিনুল মউজদীন প্রথম সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং শহরকে কবিতার শহর ঘোষণা করেন। এছাড়া জ্যোৎ¯œার রাতে শহরের স্ট্রিট লাইটের বাতি নিভিয়ে শহরবাসীকে জ্যোৎ¯œা উপভোগ করান তিনি।
সুনামগঞ্জের মতো একটি ছোট্ট শহরে ৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও একটি কলেজ (পৌর কলেজ) প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তিনি। সুনামগঞ্জ পৌরসভা পরিচালনাধীন আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন তার সময় কালেই মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। মমিনুল মউজদীনকে ভুলতে পারেন নি সুনামগঞ্জ শহরবাসী।
মমিনুল মউজদীনের মৃত্যুর পর জনপ্রিয় রাজনীতিক আয়ুব বখ্ত জগলুল বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি’২০১১ সালে প্রথম পৌর মেয়র হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন ৩১ ডিসেম্বর’২০১৬ সালে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই রাজনীতিক। তিনি মনোয়ার বখ্ত নেক’এর সহোদর। মরহুম হোসেন বখ্ত এবং বেগম নূরজাহান বখ্ত’এর তৃতীয় পুত্র।
আয়ুব বখত জগলুল ৮০ এর দশকে সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। তিনি ১৯৮৯ সালে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্যবদ্ধ প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্র রাজনীতি শেষে জেলা যুবলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গণসংগঠন আওয়ামী লীগে যোগদানের বছরই ১৯৯২ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এই রাজনীতিক। ১৯৯৭ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।
প্রায় ৭ বছর পৌর মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে  পৌরবাসীর নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে নন্দিত হন তিনি। ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সুরমা নদীর সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সংলগ্ন ঘাটে ‘রিভারভিউ’ নির্মাণ, শহরের সরকারী এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন পয়েন্টকে মুক্তিযোদ্ধা হোসেন বখ্ত চত্বর নামকরণ করে এই চত্বরকে দৃষ্টিনন্দন এবং চার কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের কিচেন মার্কেট এবং এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে আরপিননগরে ঈদগাহ্ করে প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত সুনামগঞ্জবাসী।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বললেন,‘নিজ নিজ কর্মের জন্যই তাঁরা মানুষের হৃদয়ে থাকবেন। তিনজনেই জীবিত থাকলে রাষ্ট্র এবং সমাজকে আরও অনেক কিছুই দিতে পারতেন। সম্ভাবনাময় রাজনীতিক ছিলেন এঁরা তিনজনেই।’