চীনপ্রীতির নতুন ধারা ও দেশপ্রেমের সংকট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনপন্থী ধারাটি কখনও শক্তিশালী ছিল না। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দেশ চীন। ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর একজন জেনারেলের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে স্বাধীনতা বিরোধী ডান ও কিছু চীনপন্থী বিচ্যুত বাম ধারার সমন্বিত এক শক্তি। প্রধানত যে শক্তিটি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চেতনাকে বিদায় করে পাকিস্তানি সময়ের সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো তারাই ওই সেক্টর কমান্ডার জেনারেলকে সামনে রেখে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে। আর কী আশ্চর্য, সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী চীন কিনা সেই সময়েই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করল। যেন তারা এমন এক অনুকূল সময়ের অপেক্ষাতেই ছিলো। তাই চীনকে বরাবরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিরূপেই বিবেচনা করা হয়। ফলত বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে সক্ষম হলেও চীন বাংলাদেশের মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেনি। বাংলাদেশ ও চীনের এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করার অর্থ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের সূত্রটিকে বেমালুম ভুলে বসে থাকা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই ঐতিহাসিক জন্মসূত্রের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে চীনকে কখনও হৃদয়ের মধ্যখানে জায়গা করে দেননি। চীন কিছু রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষুদ্র শক্তির ঘাড়ে চড়ে একটি অবস্থান নেয়ার চেষ্টা সবসময়ই করেছে কিন্তু কখনও সেটি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি ওই ঐতিহাসিক যোগসূত্রের কারণেই। সম্প্রতি চীনের বাংলাদেশে নিজ অবস্থান বাড়ানোর তৎপরতা একটি ভিন্ন মাত্রা পেতে যাচ্ছে বলে লক্ষ করা যায়।
নিজ দেশে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত চীন এখন কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তার দুনিয়াজুড়া বাজার সংকোচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে, করোনার সুযোগ নিয়ে চীন বিশ্বে এক নম্বর শক্তিধর রাষ্ট্রের জায়গাটি নিজের করে নেয়ার চেষ্টা শুরু করেছে বলা যেতে পারে। এই দুই কারণেই চীনের মিত্র বাড়ানোর দরকার রয়েছে। বহুদিন ধরে চীন সেই কাজটি শুরু করেছে। বাংলাদেশে নতুন নতুন চীন সুহৃদদের আবির্ভাব সেই কারণেই।
ভারত যখন করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত ঠিক এমন এক দুঃসময়ে যাবতীয় কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সীমান্ত চুক্তি ভুলে চীন ভারত সীমান্তে আক্রমণ করে বসল। আবেগতাড়িত হয়ে কিংবা মেজাজ হারিয়ে চীনা সৈন্যরা এই আক্রমণ করে ফেলেছে এমনটা ভাবা ভুল। চীনের এ এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। উপরে যে দুই কারণের উল্লেখ করা হয়েছে এই সীমান্ত সংঘাত তারই অংশ। ভারতকে বাগে নিতে পারলে পুরো উপমহাদেশে চীনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ খোলে যাবে যা তার বিশ্বমোড়ল হওয়ার বড় খায়েশ পূরণের সহায়ক হবে। উপমহাদেশের বাংলাদেশকে নিজ বলয়ভুক্ত করতে পারেনি চীন। এবার সেটাই শুরু করল তারা। চীনের উদ্দেশ্য পূরণে বাংলাদেশে তার সুহৃদ হলো সেই পুরনো স্বাধীনতার বিপরীত চেতনার কিছু ব্যক্তি, সাথে এমন কিছু বুদ্ধিজীবী যারা নানাভাবে বিতর্কিত। তারা টিভি টকশোতে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্র ভারত বিদ্বেষ ও চীনাপ্রীতি ছড়িয়ে দেয়া শুরু করেছেন। তবে একটি রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে মুছে দেয়া কতোটা কঠিন, পঁচাত্তর পরবর্তী দুই দশকের নিরন্তর চেষ্টার পরও সফল হতে না পারা এর বড় প্রমাণ। যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল জনগণ সময়ের ব্যবধানে সেই বাংলাদেশকে আবারও একাত্তরের চেতনায় ফিরিয়ে এনেছে। শক্তি ও ভরসার জায়গা এই জনশক্তি।
চীনের স্বার্থ সংরক্ষণের নামে আজ যারা উপমহাদেশকে অশান্ত করে দিতে চাইছে তারা নিশ্চিতভাবেই জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। ভারত বিরোধিতাকে যারা চীনাপ্রীতির নতুন বাক্সে বন্দি করতে চায় তারা বুঝতে অক্ষম, এও আরেক লেজুড়বৃত্তি, সেবাদাসত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতা। কখনও এক দেশের বিরোধিতা করতে যেয়ে আরেক দেশের কোলে বসাটা দেশপ্রেমিক আচরণ হতে পারে না। বরং প্রকৃত দেশপ্রেমিকরা জাতীয় স্বার্থে যেকোনো বহির্দেশীয় নিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করেন। ভারত কিংবা চীন; কেউই জাতীয় স্বার্থের উপরে উঠে আমাদের মিত্র হতে পারে না।