চুলায় পানি, তিনদিনে একবার ভাত খাইছি

বিশেষ প্রতিনিধি
তিনদিন ধইরা ঘরও পানি, ৩ ছেলে- মেয়ে লইয়া বিপদও পড়ছি। মেয়েটা ৮ম শ্রেণিতে পড়ে, বড় মেয়ে লইয়া কোনানো গিয়া উঠতাম। কোন লাখান ঘরও চৌকির উপরে আছি। রান্না-বান্নার কোন ব্যবস্থা নাই। পয়লা দিন (বুধবার) বিকালে গাঁওয়ের একজনে আইন্না সামান্য ভাত দিছলা, বাইচ্চাইনতেরে খাওয়াইছি। গতকালকে (বৃহস্পতিবার) দুইটা কেক, একটা ব্রেড আইন্না বাইচ্চাইনতেরে খাওয়াইছি, আমরাও সামান্য খাইছি। আজকে (শুক্রবার) জাহানারা বেগম’র (স্থানীয় ইউপি সদস্য) ফোনে অনেকবার ফোন দিয়াও তাইনরে ধরতাম পারছি না। ফুল মিয়া চেয়ারম্যান সাবরে (স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান) ফোন দিয়া অবস্থার কথা জানাইছলাম, তাইন কইছন দেখরাম আমি।
সুনামগঞ্জ শহরতলির গৌরারং ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামের দিনমজুর রফিক উদ্দিনের স্ত্রী শেফালী বেগম এভাবেই দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করছিলেন।
একই গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী ইয়ারুননেছার ঘরে গত দুই দিন ধরে পানি। কাল ঘরে হাঁটু সমান পানি ছিল। আজ শুক্রবার কিছুটা কমেছে। দুই ছেলে- মেয়ে নিয়ে এরাও ঘরের ভেতর চৌকির উপরেই আছেন।
কেবল ইয়ারুন ও শেফালী বেগম নয় ইনাতনগর গ্রামের কমপক্ষে ৬০ পরিবারের ঘরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। এরমধ্যে ২৫-৩০ পরিবার নিজের বসত ঘর ছেড়ে আত্মীয়-স্বজন বা অন্যের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যরা ঘরের ভেতরে মানবেতরভাবে আছে।
এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া জানালেন, তাঁর ইউনিয়নে কমপক্ষে ৫ হাজার পরিবারের ঘরে পানি ওঠেছে। উপজেলা পরিষদ থেকে মাত্র ২০০ শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং আড়াই টন চাল পেয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও কিছু সহায়তা দিচ্ছেন। এই সহায়তা একেবারেই অপ্রতুল মন্তব্য করে তিনি বলেন,‘ ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলের মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন, তাদের আরো বেশি সহায়তা করা প্রয়োজন।’
কেবল গৌরারং ইউনিয়ন নয় সুনামগঞ্জ পৌরসভারও কমপক্ষে ২০০০ পরিবারের ঘরে পানি ওঠেছে বলে জানালেন পৌর মেয়র নাদের বখ্ত। তিনি জানালেন, কোন সহায়তা না পাওয়ায় বিপদগ্রস্তদের এখনো কিছুই করা যায়নি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নে একইভাবে বহু লোক পানিবন্দি। সুনামগঞ্জ শহরতলির ধারারগাঁও বাঁধ ভেঙে কোরবাননগর ইউনিয়ন শুক্রবার সকাল থেকে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ শহরেরও একাংশে (পূর্বাঞ্চল) বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা শুক্রবার মোহনপুর ইউনিয়নের বন্যার্তদের ঘরে ঘরে ত্রাণ দিয়েছেন। আগামীকাল রঙ্গারচর ইউনিয়নের বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। ইউএনও ইয়াসমিন নাহার রুমা জানান, সদর উপজেলায় পানিবন্দি’র সংখ্যা শুক্রবার কমেছে। ঘরে পানি রয়েছে এমন সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি হবে না।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এরমধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষের ঘরেই পানি উঠেছিল । তবে শুক্রবার সকাল থেকে বেশিরভাগ ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমেছে। বন্যা পরিস্থিতিও কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। শুক্রবার সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের শ্রীধরপুর গুচ্ছগ্রাম, কলাইয়া, সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, পলাশ ইউনিয়নের ধরেরপাড়, পিয়ারীনগর, প্রত্যয়নগর সহ বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি, চিনি বিতরণ করা হয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমীর বিশ্বাস বলেন, বন্যায় উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট, ফতেপুর ও পলাশ ইউনিয়র বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই তিন ইউনিয়নের ৬ টি আশ্রয় কেন্দ্রে এবং গ্রামের ঘরে ঘরে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বন্যায় সলুকাবাদ ও ধনপুর ইউনিয়ন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা, সদর এবং লক্ষীপুর ইউনিয়নের একাংশ বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার উপজেলায় পাহাড়ী বন্যায় পানি না বাড়লেও অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।
দোয়ারাবাজারের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোনিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, বন্যা ও পাহাড়ী ঢলে উপজেলার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলার বন্যা কবলিত সুরমা ইউনিয়নের ভুজনা, উমরপুর কালিকাপুর কদমতলী, নুরপুর, সোনাপুর, দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের বন্যা কবলিতদের মধ্যে নৌকাযোগে শুকনো খাবার বিতরণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। চিড়া, চিনি, ডাল, নুডুলস, লবণ, সয়াবিন তৈল, চাউল বিতরণ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা।
জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের নি¤œাঞ্চলের ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবারের ঘরে পানি ওঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
অবশ্য. জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, জামালগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন বন্যা ও পাহাড়ী ঢলের কারণে এখনো জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। উপজেলায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেহেলী ইউনিয়ন। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক জানিয়েছেন, ৫ উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৩০০ টন চাল, দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা, তিন হাজার ৭৬৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অংশ নিতে ঢাকায় গেছেন। দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শরিফুল ইসলাম ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য যুক্ত করা যায়নি।