ছবির মুজিব-বুকের মুজিব

শাহরিয়ার বিপ্লব
খুব সম্ভবত ‘৭৭ সালের কথা। ক্লাশ থ্রি তে পড়ি গ্রামের স্কুলে। নতুন নতুন পোস্টার আসে স্কুলে। আর্মি পোষাকের ছবি। বুকে ব্যাজ মাথায় ক্যাপ। চোখে সানগ্লাস। কি এক আকর্ষণ। আমাদের প্রাইমারী স্কুলের দেয়াল ভর্তি পোস্টার। ক্লাশ বাদ দিয়ে আমরা সেই পোস্টার দেখেই সময় পার করে দিতাম। শুধু যে আমরা দেখছি তাই নয়, গ্রামের অনেক লোকেরাই সেই পোস্টারের সামনে ভিড় জমাতো।
এতো বড় রঙিন পোস্টার আমরা জীবনে প্রথম দেখি। তার উপর আর্মির পোষাক। এই দুই কারণে পোস্টারের আকর্ষণ ছিল অন্যরকম। পরে জানলাম, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ছবিতে এই পোস্টার ছিল হ্যাঁ না ভোটের পোস্টার। কিছুদিন পরে দেখি আমাদের স্কুলের এসেম্বলির সময় জাতীয় সংগীতের পর পরই আমাদের হেড স্যার ভাষণ দিতেন। ভাষনের কথাগুলি এতোদিন পর মনে থাকার কথা নয়। বুঝিও নাই। তবুও কঠিন কঠিন শব্দ যে ছিল তা মনে আছে। ভাষণের শেষে হেড স্যারের সাথে অন্যান্য স্যারেরা সামনে হাঁটতেন। আর আমরা ছাত্ররা সবাই পিছনে পিছনে প্রভাত ফেরির মতো লাইন ধরে শ্লোগান দিতাম। স্যারেরা বলে দিতেন। আর ছাত্ররা শ্লোগান দিতাম। অনেকটা এই রকম- ‘আসবে দেশে শুভ দিন- হ্যাঁ বাক্সে ভোট দিন।’
সমগ্র গ্রাম চক্কর দিয়ে তারপর সবাই ক্লাশে ঢুকতাম। স্কুলে ভালো সময় কাটলেও বাড়িতে এলে মন খারাপ থাকতো। তখন আমাদের পরিবারের দু:সময়। সারাক্ষণ আম্মার চোখে জল। আত্বীয়স্বজন এলোমেলো অবস্থায়। আব্বা কোথায় কেউ জানে না। জেলে না পলাতক। এমন অবস্থায় আমাদের ভাইবোনেরা খুব অসহায়ের মধ্যে আছি।
একদিন আম্মা বললেন,‘এই মিছিলে যাইও না। যার ছবি নিয়া তোমরা মিছিল করো, এরাই বঙ্গবন্ধুরে মারছে, এরাই তোমার বাবার মত অনেক মানুষরে জেলে রাখছে।
-স্যারেরা যে মিছিল না করলে, ক্লাস করতে দেয় না, আমি বললাম।
মা বললেন, তোমার স্যারকে আমি জিগাইছিলাম, এটা সরকারের নির্দেশ। উনাদের কিছুই করার নাই। করতেই হবে। কিন্তু তুমি যাইও না। তোমার আব্বা কষ্ট পাবেন।
সেই দিনের পর থেকে আর স্কুলেই যাই না। হাওরের কান্দায় কান্দায় ঘুরি। বাগে বাগে স্কুলের সময় কাটাই। রাত হলে স্কুলের দেয়ালে আর ঘরের বেড়ায় লাগানো পোস্টার ছিঁড়ি।
এর মধ্যে হ্যাঁ-না ভোটের দিন বিকালে শুনা গেলো, আশেপাশের সব গ্রামে হ্যাঁ বাক্স জয়লাভ করছে। শুধু আমাদের গ্রামেই ‘না’ বাক্স জিতেছে। সন্ধ্যায় নাকি পুলিশ এসে কেন্দ্রের সবাইকে মারধর করেছে।
এরপর থেকে আমাদের গ্রাম হয়ে যায় থানা পুলিশের চক্ষুশূল। আশেপাশের যে কোন গ্রামে অন্য কাজে এলেও পুলিশ আমাদের গ্রামে এসে আমাদের আত্মীয় স্বজনকে দৌড়ানি, গালাগালি করা রুটিনওয়ার্ক হয়ে গিয়েছিল।
আব্বার এক ভাগ্না। আব্বার খুব ভক্তও ছিল। নাম ইউসুফ আলী। শান্তিপুরে থাকতেন। উনি গান, কবিতা লিখতেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে কত গান লিখেছেন তার হিসাব নাই। বঙ্গবন্ধুর নামে পাগল। সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলে যেখানেই আওয়ামী লীগ-এর মিটিং হত সেখানেই তিনি হাজির হতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পরে তিনি আরো পাগল হয়ে যান। পোস্টারে বঙ্গবন্ধুর ছবিকে সামনে নিয়ে সারাক্ষণ কাঁদতেন। উনার পাঞ্জাবীর পকেটে বঙ্গবন্ধুর একটা ছবি থাকতোই। বিড় বিড় করে গান গাইতেন, ‘মেজর ডালিম হইয়া জালিম, বাংলার প্রদীপ নিভাইলো….।’ এই গানটি উনার জপমালার মতো হয়ে গিয়েছিলো। এই ইউসুফ ভাইকেও একবার পুলিশে ধরে নিয়ে গেল আমাদের বাড়ী থেকে। ১৯৭৯-এর নির্বাচনের আগে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাবার পরে তাঁর বঙ্গবন্ধু প্রেম আর বিরহ আরো বেড়ে যায়। প্রায়ই তিনি বাড়ী থেকে হারিয়ে যেতেন। সংসার ছেলেমেয়ে ছেড়ে জেলখানার গেইটে গেইটে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ এই জেলখানাগুলির সামনে পাগলের বেশে থাকতেন। নেতাদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করতেন। নেতাদের খবরাখবর এনে তাদের পরিবারকে দিতেন। দীর্ঘদিন পরে তিনি নিজের বাড়ীতে ফিরে আসেন। ফিরে এসেও আগের মতো যেখানেই মিটিং সেখানেই তিনি। যেখানেই নেতারা আসতেন সেখানেই তিনি যেতেন। একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি নেতাদের কাছে যাওয়ার জন্যে পাগল হও কেন ? তিনি বললেন,‘নেতাদের দেখলে, মুজিব কোট দেখলে, বঙ্গবন্ধুকে দেখি, আমি তাঁকেই খুঁজি।’
বেশ কয়েক বছর পূর্বে তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন জীর্ণ শীর্ণ, রোগা। আস্তে আস্তে বলেন,‘একদিন শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে এই দেশে। খুনীদের ফাঁসি হবে। কিন্তু আমি গরীব ইউসুফ আলী দেখে যেতে পারবো না। তখন হয়ত বঙ্গবন্ধুর মেয়ে ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর কথা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা ভুলে যাবে। নেত্রী বন্দনায় কর্মীরা বঙ্গবন্ধুকে দূরে ঠেলে দিবে। নেতা আর নেতা থাকবেন না। নেতা কর্মীরা বদলে যাবেন। এমপিরা বদলে যাবেন। দলও বদলে যাবে। পোস্টারের বঙ্গবন্ধু আর হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু আলাদা হয়ে যাবে। ছবি শুধু ছবিই থাকবে। বুকের ভিতরে যে বঙ্গবন্ধুর বসবাস, সেই বঙ্গবন্ধুকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি নেতাদের মুজিবকোটও বদলে যাবে। ১৯৭৫-এ সারাদেশ বাকশাল হয়ে গেলেও পরবর্তীতে ত্যাগীরা ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। আবারও বঙ্গবন্ধুর মেয়ের সাফল্যে ও সাহসে সারাদেশ আওয়ামী লীগ হয়ে যাবে কিন্তু…… বলে কাঁদতে লাগলেন।
ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,‘তখন তো চার নেতা সহমরণে জীবন দিলেন। ভবিষ্যতে…। একজন পাওয়া যাবে কিনা ? এর আগেই যেন আমাদের মরণ হয়। এর বেশী আর কিছু চাই না আল্লাহ্ র কাছে।’
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্র লীগ।