ছাতকে চাঁদাবাজির বিরোধে বন্দুকযুদ্ধ- এমন অরাজকতা প্রতিহত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের

ছাতকে নৌপথে চাঁদাবাজি নিয়ে প্রভাবশালী দুই সহোদরের বিরোধের ফলে সৃষ্ট মঙ্গলবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ গেল গরিব ঠেলাচালক শাহাব উদ্দিনের। ওই সংঘর্ষে ৯ পুলিশসহ অন্তত ৪০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংবাদপত্রে পরিবেশিত তথ্যমতে সংঘর্ষে দুইপক্ষ কমপক্ষে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং ১ শ’ রাউন্ডের মতো গুলি বিনিময় হয়েছে যুধ্যমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে। ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে অবৈধ অস্ত্রও ছিল বলে পুলিশ সুপার স্বীকার করেছেন। বৈধ অস্ত্রগুলোও যে অবৈধভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সংঘর্ষের সূত্রপাত হঠাৎ করেই ঘটেনি। বরং দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি বিস্ফোরণ ঘটেছিল মঙ্গলবার রাতে, সেই রাতটি ছাতক শিল্পাঞ্চলবাসীকে বিভীষিকার মধ্যে পতিত করেছিল। সারা শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। বিবদমান ভ্রাতৃদ্বয় ছাতকের পৌর মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও শামীম চৌধুরী স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং এরা আবার ছাতকের দÐমুÐের কর্তা ব্যক্তিও বটে। আপন দুই ভাই কেন হঠাৎ করে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লেন? প্রাপ্ত তথ্যমতে, ছাতকের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পিয়াইন, সুরমা ও চলতি নদী দিয়ে বালু-পাথর বহনকারী নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এই বিরোধ। এই পথে নাকি দিনে কয়েক লাখ টাকার চাঁদা বাণিজ্য হয়ে থাকে। অদ্ভুত সব নামের চিরক‚ট দিয়ে এই নৌপথে চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। সংবাদপত্রে এসব চিরকূটের নাম এসেছে এভাবেÑ লালকার্ড, নীলকার্ড, সবুজ কার্ড, হলুদ কার্ড, শাহজালাল পাথর ব্যবসায়ী সমিতি, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, নৌপুলিশ, বিআইডবিøউটিএ, ইসলামপুর ইউনিয়ন, নৌযান মালিক সমিতি, নৌযান শ্রমিক সমিতি, নৌযান ফেডারেশন ইত্যাদি। সকলেরই জানা কথা যে, নদীপথে বা কোন জায়গায় টুল-ট্যাক্স আদায় করতে হলে সরকার থেকে বৈধপথে ইজারা আনতে হয়। কিন্তু ছাতকে উপরে যে সব লাল-নীল চিরকূটের নাম বলা হলো সেগুলোর পিছনে এমন কোন বৈধতা নেই। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা প্রশাসন ও সরকার এবং প্রচলিত আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছেন এখানে। স্পষ্টতই এসব প্রভাবশালীরা কোন না কোনভাবে উপরোক্ত দুই ভাইয়ের দ্বারা প্রবলভাবে সমর্থিত। দৈনিক কয়েক লাখ টাকার ভাগ-বাটোয়ারা, দখল কিংবা বেদখলদারিত্ব নিয়ে মঙ্গলবার যে সংঘর্ষ হলো সেটি এই সত্যই প্রমাণ করে ছাতকে সরকারের চাইতেও এরা ক্ষমতাশালী। সারা দেশে যেমন লুটেরা চক্ররা এক একটি এলাকার গডফাদার বনে বসে আছেন ছাতকও তেমনি। এই গডফাদারদের স্বার্থের সংঘাতে গরিব ঠেলাচালকের মৃত্যু তাদের কাছে ধর্তব্য কোন বিষয়ই না।
বালু-পাথরকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, হত্যাকাÐ শুধু ছাতক নয়, জেলার বালু-পাথর বিদ্যমান এমন সবকয়টি স্পটই এমন ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুনামগঞ্জের চলতি নদীতে এমন চাঁদাবাজির বিরোধেই কিছুদিন আগে এক তরুণের প্রাণ গেছে। একটি দেশে এমন অরাজক অবস্থা নাগরিক সমাজকে বিশেষভাবে পীড়িত, মর্মাহত, আতঙ্কিত ও উদ্বেগআক্রান্ত করে রাখে। এমন অরাজকতা প্রতিহত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এইসব প্রভাবশালীদের সম্মুখে রাষ্ট্রের অসহায় চেহারা আমরা বারবার দেখে আসছি। সুতরাং ছাতকে মঙ্গলবারের সংঘর্ষটিই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার শেষ সংঘর্ষ, এমন কথা বলার সাহস আমাদের নেই। এই কথা বলতে পারেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির কর্তাব্যক্তিরা। জেলার পুলিশ সুপার মঙ্গলবার রাতের সংঘর্ষটি আরও রক্তক্ষয়ী হওয়ার আগেই থামাতে পেরেছেন, এজন্য তাঁকে এবং তাঁর অধীনস্ত পুলিশ বাহিনিকে আমাদের ধন্যবাদ। সাধারণ মানুষ এবং বালু-পাথর আহরণ, পরিবহন ও ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েক লাখ মানুষের আকাক্সক্ষা হলো, এমন বেআইনি স্বার্থের আধিপত্যের চিরতরে বিলুপ্তি।