ছাতকে নিরীহ পরিবারকে গৃহবন্দি, এমন নির্দেশ দানের ক্ষমতা কোথায় পেলেন ইউপি চেয়ারম্যান?

বাংলাদেশে ধর্মীয় ভাবাবেগে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা নেই। সাম্প্রদায়িকতার শিকার হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে সহায়-সম্পত্তি। মূলত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সহায় সম্পদ দখল করতে অথবা নামমাত্র মূল্যে কিনতে তাদের উপর নানা ধরনের নির্যাতন চালু করা হয়। সে ধরনেরই একটা ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ছাতক উপজেলায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ছাতক উপজেলার ছৈলা আফজালাবাদ ইউনিয়নের কহল্লা গ্রামের ধর্মীয় পরিচয়ে সংখ্যালঘু নিশিকান্ত দেবনাথের পরিবার সম্প্রতি ওই ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সবচাইতে অবাক করা বিষয়, এই নির্যাতনের পিছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন ওই ইউনিয়নেরই চেয়ারম্যান, যিনি আবার একজন আওয়ামী লীগ নেতা, সংগঠনের উপজেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি, গয়াছ আহমদ সংখ্যালঘু পীড়নে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংবাদে পরিবেশিত তথ্য থেকে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার নিশিকান্ত দেবনাথের সাথে জায়গা-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল লাকেশ্বর পশ্চিমপাড়া গ্রামের হারিছ আলী, আমজদ আলী এবং কহল্লা গ্রামের গৌরমনি দেবনাথের। ওই বিরোধের জের ধরে ইউপি চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দেবনাথের পরিবারকে এলাকায় গৃহবন্দি থাকার আদেশ জারি করা হয়। গত ৩১ জুলাই লাকেশ্বর বাজারে ইউপি চেয়ারম্যান গয়াছ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গ্রাম্য সালিশ বৈঠকে নিশিকান্তের পরিবারকে গৃহবন্দি থাকার আদেশ দেয়া হয়। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে নিশিকান্তের পরিবার ১২ দিন গৃহবন্দি ছিলেন বলে সংবাদে প্রকাশ। গৃহবন্দি থাকার সিদ্ধান্তটি এতোটাই কঠোর ছিল যে, যদি নিশিকান্তের পরিবারের কাউকে বাড়ির বাইরে পাওয়া যায় তাহলে তাকে ধরে চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে যিনি ধরবেন তাকে ৫ হাজার টাকা পুরস্কার প্রদানের কথাও বলা হয়।
উপরের ঘটনাটি জ্ঞাত হয়ে আমরা শিউরে উঠি। এ কোন দেশের অধিবাসী আমরা? যে রাষ্ট্রটি একটি সংবিধানের আওতায় কিছু আইন-কানুনের মাধ্যমে এবং অনেকগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা সংবিধিবদ্ধভাবে পরিচালিত হয় সেখানে একজন ইউপি চেয়ারম্যান গয়াছ আহমদ এমন আদেশ জারি করেন কোন খুঁটির জোরে? এর পিছনে কি একমাত্র কারণ এটাই যে, নিশিকান্ত ধর্মীয় পরিচয়ে সংখ্যালঘু তকমাধারী এক নিরীহ পরিবারের কর্তা? নিশিকান্তদের ধরলে, মারলে, আটকিয়ে রাখলে কোন ধরনের সমস্যা হবে না, এমন এক বেপরোয়া মনোভাব নিয়েই ইউপি চেয়ারম্যান এমন এক সামন্তযুগীয় নির্দেশ জারি করার সাহস পেলেন কি? এমন কি সরকারি প্রশাসন বিষয়টি জেনেও এই ধরনের নিষ্ঠুর, অমানবিক ও আইনবহির্ভূত নির্দেশ প্রদানের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এই ব্যবস্থা গ্রহণ না করার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয় নিশিকান্তরা আসলে কেমন আছেন। এই ধরনের উপেক্ষার কারণেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত মানসিক বিড়ম্বনা সয়ে সয়ে কোন রকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন কোন ধরনের সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে সমর্থন করা হয় না। অথচ সরকারের এমন মনোভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন সরকারি দলেরই এক স্থানীয় নেতা, যিনি কিনা আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা সরকারি প্রশাসনের প্রতি কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে চাই। গয়াছ আহমদ যে একটি পরিবারকে গৃহবন্দি থাকা এবং বাইরে বেরোলে আটকের নির্দেশ দিলেন সেটি রাষ্ট্রের কোন্ আইন বলে? যদি এরূপ কর্মকা-কে কোন প্রচলিত আইন সমর্থন না করে তাহলে এমন বেআইনি ও অমানবিক কর্মকা-ের জন্য কেন দায়ী ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই মূলত নিরীহ সকল মানব গোষ্ঠীর নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। কেউ অন্যায় করলে রাষ্ট্র তার প্রতিকার সাধন করবেন। রাষ্ট্রের পরিবর্তে যখন এক নি¤œ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে বেআইনি কর্মকা-ে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন তখন তাকে নিবৃত্ত না করার অর্থ হলো আসলে তাকে পরিপুষ্ট করা।