ছাত্রলীগের শুদ্ধি অভিযান রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করুক

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দানের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশের প্রধান এই ছাত্র সংগঠনটির সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির চলমান উন্নয়ন কাজের অর্থ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ চাওয়ার অভিযোগ উঠে। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান পর্যন্ত পৌঁছে যায় ওই অভিযোগ। পরে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাঁদেরকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এর আগে স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের সভাপতি শফিউল আলম প্রধানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল কুখ্যাত সেভেন মার্ডার হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার কারণে। মাঝখানে দীর্ঘদিন প্রধান এই ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের এরূপ কঠোর ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়নি। বিষয়টি একদিকে ছাত্রলীগের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জন্য লজ্জাজনক অন্যদিকে এই ঘটনাটি রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন রোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক অনন্য উদ্যোগ। শনিবার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর থেকেই গণমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের মাঝে এটি আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। অধিকাংশ আলোচনায়ই শেখ হাসিনার এই কঠোর সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিকতার স্খলন রোধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উদাহরণ হিসাবে একে সামনে আনা হচ্ছে। বলাবাহুল্য আওয়ামী লীগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুও তাঁর শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের যাদের বিরুদ্ধেই বড় দুর্নীতি কিংবা অপরাধবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে সব ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। যা দেশের অন্য প্রধান দলগুলোর অভ্যন্তরে সাধারণত দেখা যায় না। শোভন-রাব্বানীকে অব্যাহতি দান এই ক্ষেত্রে সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে একটি ভাল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রূপে সমাদৃত হবে বলে আমরা মনে করি।
কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দানের এই ঘটনা আওয়ামী রাজনীতিবিদদের জন্য একটি কঠিন বার্তা মনে হতে পারে। শেখ হাসিনা বলেছেন শুধু তার নিজের ইমেজ দিয়ে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য নেতা-কর্মীদের জনগণের কাছে পরিচ্ছন্ন ইমেজ তৈরির আহ্বান তিনি জানিয়েছেন। এ কথা সত্য যে, দেশ শাসনকারী দলের নেতা-কর্মীরা আমাদের দেশে মোটাদাগে ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির ব্যবস্থা করে থাকেন। রাজনীতি করে আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাওয়া এখন একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করতে যেয়ে সাধারণ মানুষের নিকট দল ও নেতাদের ভাবমূর্তি কতটা ম্লান হয় সে হিসাব কখনও কেউ করেননি। শেখ হাসিনা সেই কাজটি শুরু করেছেন। আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই।
ছাত্রলীগের পদ-পদবি পেতে সকল স্তরে যে লাগামহীন প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় তার পিছনে একটিই উদ্দেশ্য নিহিত থাকে, সেটি হলো পদ লাভ করে নিজের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন করা। কেন্দ্রীয় সভাপতি-সম্পাদকের এই করুণ ভাগ্য বরণ করা থেকে সকল স্তরের নেতাকর্মীরা যদি পাঠ গ্রহণ করেন তাহলে সেটি হবে এই দেশের রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সূচনা। দেশের প্রধানমন্ত্রী এই শুভ সূচনাই দেখতে চাচ্ছেন। দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীকে দল প্রধানের এই অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিতে হবে। এই দেশটি এখন দুর্নীতির ভারে পঙ্গুত্ব বরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশকে বাঁচাতে দুর্নীতি দূর করতে হবে সর্বাগ্রে। আর দুর্নীতি দুরিকরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে রাজনৈতিক পরিম-ল থেকেই। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলই দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। দল ও এর নেতারা যদি দুর্নীতিমুক্ত হন তাহলে অপরাপর দুর্নীতির হোতারা মুখ লুকাতে বাধ্য হবে।
শোভন-রাব্বানীর পরিণতি থেকে সকলেই শিক্ষা নিবেন এই হলো সকলের আশাবাদ। নতুবা যে কেউ যেকোনো সময় খরখুটোর মতো উড়ে যেতে পারেন, শোভন-রাব্বানীর ক্ষমতা হারানো থেকে বড় প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না।