ছুটির দিনে নিউইয়র্ক

ইশতিয়াক রুপু
নিউইয়র্কে সপ্তাহের শেষ দু দিনের দ্বিতীয় দিন রোববার।বেশ গরম পড়েছে প্রথম আজ। ২১ ডিগ্রী সেলসিয়াস মানে ৭০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। সোসাল ডিসটেন্সের কড়া নিয়ম মেনে শতাধিক পরিবার সারাদিন কাটাতে ভীড় করেছে সেন্ট্রাল পার্কে। পাশের রাজ্য নিউজার্সীর পাঁচটি পার্কে ভাল পরিমান পার্ক প্রেমিদের ভিড়। দু রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ছিলো তৎপর। নিউইয়র্কে তিন জন আইন ভঙ্গ কারীদের নামে মামলা ঠুকে দেওয়া ছাড়া ও অর্ধশত আইন ভঙ্গকারীদের সমন দেয়া হয়েছে। মেয়র ডি ব্লাজিও বলছেন করোনার প্রকোপ ধীরে ধীরে আয়ত্বে আসছে মনে করলেও এই অবস্থা ধরে রাখতে আমাদের আরো সাবধান হতে হবে।৩রা মে রবিবার হাসপাতালে রোগীর ভর্তির সংখ্যা সামান্য হেরফের হলেও মোট মৃত্যুর সংখ্যা নিউইয়র্কে তিনশতের কম। তবে নিউজার্সীর সংবাদ আশা ব্যঞ্জক নয়। করোনার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া নিউইয়র্কের দুই সেনাপতির একজন গভর্নর কুওমো অন্য জন মেয়র ডি, ব্লাজিও।প্রথম বারের মত সাত রাজ্যের গভর্নর যৌথ ভাবে সংবাদ সম্মেলন করলেন ৩রা মে রবিবার। করোনা ভাইরাসের কারনে সৃষ্ট মহামারী কে মোকাবিলা করবার লক্ষে প্রয়োজনী চিকিৎসা সামগ্রীর মজুত বাড়াতে অভিন্ন পলিসি নির্ধারন করলেন সবাই মিলে। যা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা। রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক, নিউজার্সী, কানেকটিকা, পেনসেলভ্যানিয়া, দেলওয়ার, ম্যাসাচুসেটস ও রোড আইল্যান্ড। সবার যৌথ সিদ্ধান্ত সকল রাজ্যের চিকিৎসা সামগ্রীর মজুদ কমপক্ষে তিন মাসের সমপরিমান করা এবং সমগ্র চিকিৎসা সামগ্রী যৌথ ভাবে ক্রয় করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এদিকে নিউইয়র্কে প্রথম থেকে সকল মিডিয়া ও জনপ্রতিনিধির মুল অভিযোগ ছিলো পাতাল রেলের চলাচলে ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে। সর্ব মহল থেকে সাবওয়ে সার্ভিস বন্ধ করার দাবী উঠলে ও মেয়র সে প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না।যুক্তি ছিলো এতে করে জরুরী কর্মীদের কাজে যেতে অসুবিধা হবে।গতকাল থেকে শুরু হয়েছে পাতালরেলের প্রতিটি কামরা জীবানুনাশক দিয়ে ধৌত করে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ রাখা। ১১৫ বছরের ইতিহাসে রাত ১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সাবওয়ের সকল লাইনে রেল চলাচল বন্ধ।গভর্নর কুওমো নিজে এই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কর্মসূচী তদারক করছেন। শুক্রবার ও শনিবার দুজন গৃহহীনের লাশ পাওয়া গেছে পাতাল রেলের কামরায়। পুলিশ মৃত্যর কারন এখনো জানাতে পারে নি। আরো একটি দুঃখজনক সংবাদ ছিলো, সুদুর কলোরাডো রাজ্য থেকে আসা ৬৬ বৎসর বয়স্ক পল কেরি নামের একজন স্বাস্থ্য কর্মী ৩০ শে এপ্রিল করোনার ছোবলে প্রান হারান স্টেটান আইল্যান্ডের এক হাসপাতালে।
বীর যোদ্ধা প্যারামেডিকস পল কেরি কে শেষ সালাম জানালেন নিউইয়র্কের সকল সহযোদ্ধারা। মহামারীর আঘাতে বিপর্যস্থ নিউইয়র্কের অভিবাসী সমাজের অনেক বিত্তবান ও সমাজ সেবকরা এগিয়ে আসছেন দৃঢ চিত্তে। কেউবা খাদ্য সামগ্রী নিয়ে দিন রাত ছুটে চলছেন অভাবীদের দ্বারে দ্বারে।যার মধ্যে আছেন নিউইয়র্কস্থ আঞ্চলিক অনেক বাংলাদেশী সংগঠন।সব সংগঠনের সিনিয়র কর্মকর্তারা সহ অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবকরা নিজ কাঁদে তুলে নিয়েছেল এই মহান দায়িত্ব। সবার অকুন্ঠ প্রশংসা পাচ্ছেন সেই সব করোনা যোদ্ধার দল। সেই যোদ্ধাদের সংগে আরো আছেন বাংলাদেশী এক অকুতোভয় ডাক্তার। বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় মিডিয়া হাউসগুলো
ইতিমধ্যে সমানে উনার সমাজ সেবা নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করে চলছে।যিনি নিজ পেশাকে সর্ব্বোচ অগ্রাধিকার দিয়ে দিনের অধিকাংশ সময় ছুটে যাচ্ছেন বাংলাদেশী নেপালী বৈধ কিম্বা অবৈধ নারী পুরুষ নির্বিশেষে সংকটে পতিত অভিবাসীদের পাশে। তিনি হলেন কুমিল্লার সন্তান, বাংলাদেশের গৌরব, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সেনানী ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার। তার মতে, আমাদের আরে বেশি করে ঝাপিয়ে পড়েতে হবে।এই ভাইরাস কে দুর্বল বা ক্ষনস্থায়ী ভাবলে চলবে না। ক্ষতির হিসাবে আমরা আজ আবার হারালাম দুজন বাংলাদেশী কে। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সমীর চন্দ্র দেব অন্যজন হলেন মৌলভীবাজার নিবাসী অনেক পুরানো অভিবাসী সমাজ সেবক হাজী কয়সর আহমদ (৭৭)। নিউইয়র্কের শোকাহত বাঙ্গালী সমাজ আর কোন শোক সংবাদ শুনতে চায় না।এখনো পর্যন্ত আমরা মোট হারিয়েছি ২৩১ জন।রোববার পেরিয়ে নিউইয়র্কে সন্ধা নামবে। ভয়ার্থ আর শংকিত নিউইয়র্কবাসী অবরুদ্ধ আরেকটি রাতের মুখামুখি হবে। ঘরে আবদ্ধ পরিবারের সদস্যরা কেউ কেউ মেতে উঠবে টেলিভিশনের পর্দায় পছন্দের সিনেমা দেখার আয়োজনে। কেউবা ব্যস্থ হবেন ইউ টিউবে দেখা পছন্দের কোন খাবার আইটেম তৈরীর উত্তেজনায়। কেউ বিছিয়ে নিচ্ছেন জায়নামাজ। সারতে চাইছেন রমজানের রাতের প্রথম ভাগের ইবাদত। সৃষ্টিকর্তার নিকট চাইবেন মাগফেরাত। ভাল খবর যেটি তা হলো আজ রাতে বাইরে সাইরেনের আওয়াজ অনেক কম শুনা যাচ্ছে। টিভির পর্দায় চলছে মহামারি ঠেকাতে নানা মুনির নানা মতের পর্ব। কতই না আশার বাণী। কোন কোন বিশ্লেষক বার বার জোর দিয়ে বলছেন,সামনে আমাদের অনেক কষ্ট আর দূঃখের পথ হাঁটতে হবে। পৃথিবী হয়তো সেই পূর্বের ন্যায় আর নাও আসতে পারে। তারপর ও আমরা আগামির সুরু টানেলে দেখছি শান্তি আর সুখের জ্বলজ্বলে আলো।