ছেলেবেলায় বৈশাখী আনন্দ

মো.মশিউর রহমান
বাংলাদেশের প্রকৃতি খুবই অনন্য। প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর এখানে ঋতুর পরির্বতন ঘটে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর প্রতিটি ঋতুই দেশে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির হয়। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসে ব্যাপক বৈচিত্র লক্ষ করা যায়। বৈশাখ মাস বাঙালি জাতির কাছে ভিন্ন এক আমেজ নিয়ে হাজির হয়। ইদানিং দেশের শহরগুলোতে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় বেশ জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে। কিন্তু গ্রামের বৈশাখ ভিন্ন আমেজ নিয়ে গ্রামীণ জীবনে হাজির হয়। আমার জন্ম সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের একটি অবহেলিত গ্রামে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত গ্রামটির নাম মশালঘাট। কে এই গ্রামে প্রথম মশাল জ্বালিয়েছিলেন তা আজো জানা হলো না। তিনটি পাড়ায় শতাধিক পরিবার নিয়ে গ্রামের মানুষের মিলেমিশে বসবাস। জেলার বড় হাওরগুলোর মধ্যে অন্যতম শনির হাওরপাড়ের দক্ষিণ পূর্ব দিকে গ্রামটির অবস্থান। কৃষক পরিবারে আমার জন্ম। বাবা পৈত্রিক সূত্রে দাদার কাছ থেকে সংসার চালানোর মতো বেশ কিছু জমি পেয়েছিলেন। পরে নিজের উপার্জিত টাকায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করেছিলেন। কৈশোর পর্যন্ত সময়টা গ্রামেই কেটেছে। লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হওয়ার জন্যে তারপর শহরের আলো বাতাসের সংস্পর্শে আসা। গ্রামে জন্ম তাই জন্মের পর থেকেই হাওরপারের সংস্কৃতিতেই বেড়ে উঠা। ছেলেবেলায় বৈশাখ মাস এলেই ভিন্ন এক খুশির আমেজ সৃষ্টি হতো। নতুন ধানের ম ম গন্ধ। সোনার ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতি চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুরু হয়ে যেত। বড় কৃষকের বাড়িতে ছয় মাসের চুক্তিবদ্ধ কামলারা ( শ্রমিক) লেগে যেত খলা ( মাঠ) তৈরিতে। যেখানে ক্ষেত থেকে ধান কেটে রাখা হবে। খলার এক পাশে একটি ছোট ঘর তৈরি করা হতো। যেটাকে উড়া বলা হয়। সেই উড়াতে কামলারা রাতে অবস্থান করে ধান পাহারা দিত। বৈশাখ মাসে ধান কাটার জন্যে বেপারীর ( ধান কাটার শ্রমিক) প্রয়োজন হতো। স্থানীয় বেপারীদের পাশাপাশি চৈত্র মাসের শেষ দিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ফরিদপুর, মাদারীপুর থেকে বড় সাজানো নৌকা যোগে বেপারীরা এসে আমাদের এলাকায় ভিড় জমাত। তাদের সুসজ্জিত বাহারী ডিজাইনের নৌকাগুলো স্থানীয় বেহেলী বাজারের ঘাটে বেঁধে রাখা হতো। নৌকায় বেপারীরা তাদের এলাকার গুড়, তেতুল সহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। পরিচিত বিভিন্ন বাড়িতে এগুলো বাকিতে বিক্রি করতো। বিক্রিত জিনিসের টাকার বিপরীতে বৈশাখ মাসে তারা ধান সংগ্রহ করতো। সেই ধান নৌকা দিয়ে নিজ এলাকায় নিয়ে যেত। বৈশাখ মাসে খলায় বেপারীরা খড়, বাঁশ ও চিকন দিয়ে একটি বড় উড়া ( অস্থায়ী ঘর) বানাতো। সেখানে বিশ পঁচিশ জনের মতো ব্যাপারী রাতে ঘুমাতো। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর উড়ার সামনে জড়ো হয়ে অনেকেই এক সাথে গান গাইতো। বাজনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো থালা, স্টিলের গ্লাস, বাটি, ছোট কলস। অনেকে আবার বাঁশিতে সুর তুলে হৃদয়ে ঝংকার তুলত। সেই সুরে মুগ্ধ হতো অনেকেই। থাকতো পুঁথি পাঠের আসর। ব্যাপারীদের মধ্যে অনেকেই আবার কিচ্ছার আসর বসাতো। ধান কাটার শেষ দিকে নাটকের আয়োজনও ছিল। থাকত জাদু দেখানোর আসর। মুগ্ধ হয়ে কিচ্ছা বা গান শুনতাম। যাদু দেখার অপেক্ষায় থাকতাম। বাড়ির সামনে বৈশাখ মাস জুড়ে থাকত মিষ্টি, জিলাপী তৈরির অস্থায়ী দোকান। ধান দিয়ে এগুলো কিনতে পাওয়া যেত। অনেক সময় আমাদের বয়সীরা লুকিয়ে ধান চুরি করে মিষ্টি কিনে আনত। আমার বাবা বৈশাখ মাসের এক দুই দিন বাড়িতে বেশি করে মিষ্টি, জিলাপী, আঙ্গুর ভাজা, তিলুয়া বাতাসা, খইয়ের লাড়ু কিনে আনতেন। তাতে বেশ কয়েকদিন উৎসব আকারে মিষ্টি খাওয়া যেত। পহেলা বৈশাখে স্থানীয় সাচনাবাজারে দোকানগুলোতে হালখাতা উৎসবে সনের মিষ্টি খাওয়ার জন্যে বেশ উদগ্রীব থাকতাম। বাবা যে যে দোকান থেকে বাজার করতেন তারা বাবাকে সনের কার্ড দিয়ে দাওয়াত করতেন। মাঝে মাঝে বাবা আমাকে সনের দিন সাচনাবাজারে নিয়ে যেতেন। না যেতে পারলে কাউকে সাথে দিয়ে পাঠাতেন। আব্বার সাথে দোকানীদের ভালো সম্পর্ক থাকায় তারা আমাকে বেশ সমাদর করতেন। কয়েটা মিষ্টি খাওয়ার পর আরো মিষ্টি খেতে দিতেন। আমার কাছে ছোট বেলায় সন মানেই ছিল মিষ্টি খাওয়া। পুরুষ মহিলা হকাররা গ্রামে গ্রামে বাড়িতে ভিড় করতো মেয়েদের কাছে বাহারী জিনিস বিক্রি করতে। চুড়ি, আলতা, মাথার ফিতে, মাটির তৈরি খেলনা তৈযসপত্রসহ সহ মনকাড়া অনেক জিনিস। এগুলো মহিলা ও মেয়েদের কাছে ধান দিয়ে বিক্রি করতো। পুরো বৈশাখ মাস জুড়েই থাকতো আনন্দ আর আনন্দ। পড়াশুনা করতে হতো না। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে অঘোষিত বন্ধ থাকতো। বইগুলো বেঁধে সেলফে রেখে দিতাম। পড়াশুনা না থাকায় খুবই খুশি খুশি লাগত। সবার বাড়িইে নতুন নতুন ধানের গন্ধ। নতুন চালের ভাত। রাতে পরিবারের সবার খাওয়া শেষে বাড়তি ভাত মা পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতেন। যাতে ভাত নষ্ট না হয়। ভোরে উঠে সেই ভাত লবণ ও ভাজা শুকনো মরিচ দিয়ে ভাই বোনেরা খেতাম। সেটাই পান্তা ভাত। শহুরে লোকজন এখন পহেলা বৈশাখে ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়াকে সংযুক্ত করেছেন। তারা মাটির সানকিতে পান্তা ভাত খেয়ে একদিনের বাঙালির পরিচয় দেন। আমাদের গ্রামের সেই পান্তা ভাত গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য। ভোরে সূর্য উঠার পূর্বেই গরু দিয়ে ধান মাড়াই শুরু হতো। সকাল দশটার মধ্যেই অনেক ধান মাড়াই করা হতো। নিজে ধান মাড়াইয়ে অংশ নিতাম। দেশে কৃষির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবার পূর্বে প্রতি বাড়িতেই অনেকগুলো গরু থাকতে হতো। ধান মাড়াই করার জন্যে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এই ধান মাড়াই আর চোখেই পরে না। সবাই মেশিনে দ্রুত ধান কেটে ও মাড়াই করে ফেলে। প্রকৃতির উপর বৈশাখের আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করতো। অনেক বছর প্রকৃতি বিরূপ থাকতো। বৈশাখ শুরুর পূর্বেই পাহাড়ী ঢলে ও বৃষ্টির পানিতে নদীগুলো পানিতে উপছে উঠতো। এখনও যেটা লক্ষ করা যায়। ছেলেবেলায় বেশ কয়েক বছর চোখের সামনেই সোনার ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। সেই ফসলহানিতে বাবার আর্থিক অবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। এক সময় বাবার সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পরে। ক্ষেতের ফসল হারিয়ে বাবাকে নিরবে চোখের পানি ফেলতে দেখেছি। তখন অসহায় বাবার চোখের জল আমাকে খুবই ব্যথিত করতো। প্রাথমিকে পড়ার সময়ে আমাদের বাড়িতে দুজন শিক্ষক লজিং থাকতেন। বৈশাখ মাসে ধান তোলায় তাদেরও অংশগ্রহণ থাকতো। তাঁরা স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। এক বছর রাতে হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করছে। হাওরের আশে পাশের গ্রামগুলোতে লোকজনের উচ্চ স্বরে চিৎকার শুরু হয়েছে। গ্রামের মসজিদে মসজিদে বাঁধ রক্ষা করার জন্যে সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। উড়া, কোদাল, বস্তা নিয়ে বাঁধে যাবার জন্যে বার বার মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে। ছোটবেলায় এই দুঃসময়ে বড়ই কষ্ট পেতাম। দোয়া দুরুদ পড়তাম। বাঁধটা যাতে না ভাঙ্গে। হাওরের পানি প্রবেশ করে যদি ফসল নষ্ট হয়ে যায় তবে এক বছর মারাত্মক আর্থিক কষ্টে যাবে। পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটবে। দেখতাম বাবার পেরেশানী শুরু হয়ে গেছে। ভোরে জানা গেল সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ও বাঁধটি রক্ষা করা গেল না। দুশ্চিন্তায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। সকালে দেখি আহাম্মক খালী বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে দ্রুত গতিতে পানি প্রবেশ করছে। সাত আট ঘন্টার মধ্যেই পুরো হাওর পানিতে তলিয়ে যাবে। চোখের সামনেই সোনার ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। বালক মনে সেই ব্যাথা আজো ভুলতে পারিনি। সবাই ক্ষেতে কাঁচা পাকা ধান কাটার জন্যে কাঁচি নিয়ে দৌঁড়াচ্ছে। এই দুুর্দিনে আমার স্যারও বসে নেই। বাবার মন খারাপ দেখে স্যারও কাঁচি নিয়ে মাথায় গামছা বেঁধে ধান কাটতে ক্ষেতে চলে গিয়েছেন। স্যারসহ কামলাদের জন্যে বড় গামলার মধ্যে শুটকির তরকারি দিয়ে ভাত নিয়ে ক্ষেতে গেলাম। নিজেও হাওরে ভাত খেলাম। খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেই ভাত খাওয়ার মজাই আলাদা। স্যার একাই দুপুরে কিছু ধান কেটে গরুর গাড়ি নিয়ে খলায় ফিরলেন। এর কয়েক বছর পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমার প্রিয় স্যার আব্দুল মোতালেব মারা যান। ফসলহারা একজন কৃষকের ব্যথা শুধু কৃষকের সন্তানেরাই উপলব্ধি করতে পারে। একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে যা আজো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি। ভাবতাম বড় হয়ে পড়াশুনা করে নিজে অনেক টাকা উর্পাজন করব। বাবার দুঃখটাকে খুশিতে ভরিয়ে দিব। পুরো বৈশাখ মাস এভাবেই ধান মাড়াই, গোলায় ধান তোলায় ব্যস্ত সময় পার হতো। অনেক বছর বাবা প্রচুর ধান পেতেন। গোলায় ধান রাখার জায়গা না থাকায় খলায় অনেক ধান বিক্রি করে দিতেন। ধানের টাকায় বাড়িতে ছয় মাসের কামলাদের নতুন জামা কিনে দিতেন। আমাদের ভাই বোনদের জন্যে নতুন জামা কিনে আনতেন। ছেলেবেলায় সোনালী সময়টা আজ খোঁেজ পাই না। সময়ের ব্যবধানে বাবাও কৃষিকাজ থেকে পুরোপুরি অবসর নিয়েছেন। ছোট ভাই বোনেরাও এ পেশায় নেই। তাই কৃষকের সন্তান হিসেবে সেই আবেগও নেই। শহরের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে পহেলা বৈশাখে মেয়েকে নিয়ে পান্তা, ইলিশ খাওয়া, সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান উপভোগের মধ্য দিয়েই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি। কিন্তু গ্রামীণ জীবনের সেই বৈশাখ আজও খুজেঁ বেড়াই। ছেলেবেলায় গ্রামে বৈশাখে খলায় বেপারীদের গলা ছেড়ে গাওয়া গান, সেই পান্তা ভাত আমাদের যে আনন্দ দিতো সেই আনন্দ নাগরিক জীবনে খুঁেজ পাই না। তারপরও প্রতি বছর বৈশাখ আসে। বৈশাখ যায়। রয়ে যায় শুধুই স্মৃতি। সেই স্মৃতি আকড়ে ধরেই জীবনের বাকি দিনগুলি পার করে দেয়ার প্রত্যাশায় এগিয়ে যাচ্ছে সময়।
লেখক : প্রভাষক, সরকারি দিগেন্দ্র বর্মন কলেজ, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ।