জগন্নাথপুরে দুই শিশুকে বেঁধে নির্যাতন

জগন্নাথপুর অফিস
জগন্নাথপুরে চুরির অভিযোগে দুই শিশুকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে শিকল দিয়ে হাত-পা বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। গত ৫ জুন বেলা ১১ টায় রানীগঞ্জ ইউনিয়নে বাগময়না গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
নির্যাতিত শিশুরা হলো, রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের সফিক আলীর ছেলে সুলেমান মিয়া (১২) ও পাইলগাঁও ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের লেবু মিয়ার ছেলে লেচু মিয়া (১০)। এঘটনায় বুধবার জগন্নাথপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে দুই শিশু নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে প্রকাশ হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে ও ছবিতে দেখা যায়, দুই শিশুর হাত-পা লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের রশি দিয়ে বেঁধে দুই যুবক লাঠি দিয়ে বেদম পেটাচ্ছে। উপস্থিত কৌতুহলী স্থানীয় লোকজন শিশু নির্যাতনের দৃশ্য দেখছে। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে তা ভিডিও করছে। আবার কেউ মারধরে সহযোগিতা করছে। ‘ও মাই গো’ বলে শিশুরা চিৎকার করলেও নির্যাতনকারী ও উপস্থিত কারোর মন গলেনি।
অভিযোগ উঠেছে, রানীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুন্দর আলীর ছেলে শানুর মিয়া ও জামায়াত নেতা আবুল কাশেম দুই শিশুকে নির্যাতন করেছেন। এ ঘটনায় নির্যাতিত ইসলামপুর গ্রামের শিশু সুলেমান মিয়ার পিতা সফিক আলী বাদী হয়ে জগন্নাথপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। গতকাল বুধবার থানায় ১১জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ প্রদান করা হয়। অভিযোগে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরো ২৫/৩০ জনের কথা উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুন রাতে তেরাবির নামাজের সময় রানীগঞ্জ বাজারের ফ্যামিলি শপ নামের একটি স্টোরে চুরির ঘটনা ঘটে। দোকানের মালিক সাজু মিয়া দাবি করেন, তার দোকানের অন্তত লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি হয়েছে। তবে তিনি থানা বা বাজার পরিচালনা কমিটির কাছে অভিযোগ করেন নি। সাজু মিয়া কারো নাম উল্লেখ করেনি। কিন্তু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সুন্দর আলীর ছেলে শানুর মিয়া ও স্থানীয় জামায়াত নেতা আবুল কাশেম নিজেরাই অতি উৎসাহী হয়ে চোর ধরার উদ্যোগ নেন। রাতেই ওই দুই শিশুকে চুরির অভিযোগে বাড়ি থেকে ধরে এনে বাগময়না গ্রামের রইছ উদ্দিনের বাড়িতে শিকল ও রশি দিয়ে রাতভর বেঁধে রাখা হয়। পরদিন ৫ জুন রইছ উদ্দিনের বাড়ির আঙ্গিনায় চুরির শালিস বিচার হয়। বিচারে দুই শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে প্রকাশ্যে শতশত লোকজনের উপস্থিতিতে লাঠি দিয়ে বেধরক পেটানো হয়। কিন্তু তারা চুরির সাথে জড়িত বলে কোন স্বীকারোক্তি না দেয়ার দুপুরে জগন্নাথপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। কোন অভিযোগ না থাকায় পুলিশ তাদেরকে ছেড়ে দেয়।
রানীগঞ্জ বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজমল হোসেন মিটু বলেন,‘ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সুন্দর আলীর ছেলে শানুর মিয়া ও স্থানীয় জামায়াত নেতা আবুল কাশেম নিজেরাই চোর ধরার উদ্যোগ নেন। দোকান মালিক কাউকে অভিযুক্ত না করলেও তাঁরা শিশু দুটিকে অমানবিক নির্যাতন করেছেন। ওই দুই শিশুর কাছে চুরির কোনো মালামাল পাওয়া যায় নি।’
নির্যাতিত শিশু সুলেমান মিয়ার বাবা সফিক আলী বলেন, ‘ আমি গরিব মানুষ। আমার ছেলেকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হয়েছে। যারা আমার ছেলেকে মারধর করেছে তাদের হুমকিতে মামলা করতে পারিনি। ছেলের চিকিৎসার পর ভিডিও ফুটেজ দেখে মামলা করেছি।’ নির্যাতনের পর থেকে তাঁর ছেলে ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।
জগন্নাথপুর থানার অফিসার ইনচার্য (ওসি) হারুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন,‘ চুরির অভিযোগে এলাকাবাসী দুই শিশুকে আটক করে ৫ জুন থানায় হস্তান্তর করেছিলেন। অভিভাবকদের মুচলেকায় ওই দুই শিশুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আজ এক শিশুর বাবা লিখিত অভিযোগ করে বলেছেন তার ছেলেকে বেঁধে মারধর করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’