জগৎ কল্যাণময়ী মা ‘দুর্গা’

যোগেশ্বর দাশ
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা
নমস্থৈস্যৈ নমস্থৈস্যৈ, নমস্থৈস্যৈ নমো নমঃ ॥
যদা যদাহি সাধুনাং দুঃখং ভবতি দানব তদা তেষাঞ্চ রক্ষার্থং দেহং সন্ধ্যরয়ামৎহম। অরুপাশ্চ মে রূপম জন্মায়াশ্চ জন্মচ সুরানাং রক্ষানার্থায় বিদ্দিদৈত্য বিনিশ্চিতম॥ ( দেবী ভাগবত ৫/১৮, ২২-২৩)
দেবী ভাগবতে ভগবতী দুর্গা স্বমুখে নিজের রূপ পরিগ্রহের তত্ব মহিষঅসুরকে বলেছেন। যিনি অরুপা, যার জন্ম নেই, যে আদ্যশক্তি পরমা প্রকৃতি, ব্রহ্মের পট্টমহিসী বলে যাকে তন্দ্রে বলা হয়েছে, তিনিই পরমা প্রকৃতি জগৎকে রক্ষা করার জন্য সাধুদের দুঃখ দূর করে দানব রূপী, দুরাচারী, দুর্বৃত্তদের দমন করতে বার বার নিজ মায়া বলে স্বর্গ ও মর্ত্যে অবতীর্ন হন। তিনি তো জগজ্জননী, সকলের মা। তাই প্রয়োজনে সন্তানদের শাসন করার জন্য তাকে কঠোর হতে হয়। তাকে ভীষনা উগ্রমূর্তি ধারন করতে হয়। তিনি তাদের পরাজিত করলেও একেবারে ত্যাগ করেন না। তাই পরাজিত দানব শ্রেষ্ঠ মহিষাসুরকে তিনি তার চরনে ঠাঁই দিয়েছেন। তিনি কালিরূপে অসুরদের বধ করে তাদের মুন্ড ও হাত গুলিকে নিজের শরীরে ধারন করেছেন। মায়ের এই মহিমা অতুলনীয়।
আবার ত্রেতা যুগে রাম রাবনের যুদ্ধে দেবতাদের সহায় হন। ব্রহ্মাকে বলেন শারৎকাল দেবতাদের অকাল। অর্থাৎ দেবতারা তখন নিদ্রিত। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে রাবন বধ করার জন্য রামচন্দ্রকে সাহায্য করতে হবে। ব্রহ্মা মর্ত্ত্য ভূমিতে এসে রামচন্দ্রকে পরামর্শ দান করেন। ব্রহ্মার পরামর্শে রামচন্দ্র অকাল বোধনের মাধ্যমে মা দুর্গার আরাধনা করেন। ষষ্ঠী পর্যন্ত বিল্বমূলে দেবীর বোধন আমন্ত্রন ও অধিবাস করার পর ৭মীতে মৃন্ময়ী মূর্তিতে বিশেষ আহবান করেন। ৮মী ও ৯মী তিথির সন্ধি ক্ষণে বিশেষ পূজার পর নবমি পূজা সমাপন করে দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন করেন। এই নবমী তিথিতেই মায়ের কৃপায় রাবন বধ করেন। এই বিবরণ মহাভাগবত পুরানে আছে। এজন্য শরৎকালীন এই পূজাকে অকাল বোধনের পূজা বলা হয়। কালে এই পূজাটি বাংলার ঘরে ঘরে উৎসব মুখর হয়ে উঠে। কিন্তু মূল দুর্গা পূজা চৈত্র মাস অর্থাৎ বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যাহা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। বঙ্গদেশে দুর্গাপূজা কখন আরম্ভ হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস বলা বড় কঠিন। তবে যতদূর জানা যায়, ষোড়শ শতকে তাহিরপুরের রাজা উদয় নারায়ন যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন ইচ্ছা প্রকাশ করলে পন্ডিতগণ তাহাকে উহা হতে প্রতিনিবৃত্ত করে। কারন কলিতে অশ্বমেধ যজ্ঞ শাস্ত্র বিহিত নহে। সুতরাং তাহার পরিবর্তে পন্ডিতগণ রাজাকে দুর্গা পূজার বিধান দান করেন। যাহা অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য। রাজা উদয় নারায়ন স্বীয় উদ্যোগে তাহা পালন করতে পারেন নাই। কিন্তু তাহার পৌত্র রাজা কংস নারায়ন তৎকালে প্রায় আট লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে জগজ্জননী মা দুর্গার পূজা করেছিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত থেকে জানা যায় শ্রী রামকৃষ্ণদেবের শ্রী দুর্গা নামে অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল। দুর্গতি নাশক দুর্গা নামের এবং উদ্দিষ্ঠ জগন্মাতার প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে গিয়ে তিনি বহুবার গেয়েছেন Ñ“আমি দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি/আখেরে এ দিনে না তারো কেমনে, জানা যাবে গো শঙ্করী।” তিনি আরও বলেছেন দুর্গা নাম জপ করলে মানুষের দেহমন শুদ্ধ হয়ে যায়। তাঁর আরো একটি প্রিয় গান “দুর্গা নাম জপ সদা বাসনা আমার/দুর্গমে শ্রীদুর্গা বিনে কে করে নিস্তার।”
দেবী দুর্গা নামটি দেবী ভাগবতে প্রচারিত হয়েছে। দুর্গম বা দুর্গা নামে এক অসুরকে বধ করে। তিনি নিজেই বলেছেন ‘দুর্গা দেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি’ (শ্রীশ্রী চ-ী ১১/৪৯-৫০)
আশ্বিন মাসে প্রকৃতি অপূর্ব রূপে সজ্জিত হয়। মহিসাসুরের অত্যাচারে দেবগণ সিংহাসন চ্যুত তখন সকল দেবতাদের সম্মিলিত তেজ রশ্মি হতে সৃষ্ট মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে রক্ষা করলেন ধরিত্রী আর দেবকূলকে। তাই মায়ের অপর নাম মহিষমর্দিনী।
কার্তিক মাসে তিনি জগদ্ধাত্রী রূপ ধারন করে পৃথিবীতে আসেন। দুর্গা নবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী দেবীর পূজা হয়। শঙ্খ, চক্র, ধনু ধারিনী সিংহবাহিনী রূপে জগৎ পালন করেন তিনি।
অগ্রহায়নে আসেন কাত্যায়নী রূপে। ধনে ধান্যে ভরে উঠে ধরিত্রী প্রকৃতিতে প্রাণের সঞ্চার হয়। মহিলারা স্বামীর মঙ্গল কামনায় কাত্যায়নী ব্রত পালন করেন।
পৌরষ মাসে আসেন পৌষ কালী রূপে। এই পূজা করলে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ হয়। তীর্থ ভ্রমণের প্রয়োজন হয় না।
মাঘ মাসে আসেন তিনি রটন্তি কালী রূপে। মাঘ মাসের কৃস।ণপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য রাধারানী কৃষ্ণ আরাধনায় মগ্ন। এদিকে রাধিকার স্বামী আয়ান ঘোষ অনেক খুঁজে দেখেন রাধারানী তাঁর আরাধ্য দেবতা রটন্তি কালীর পদতলে। আয়ান ঘোষ অবাক হয়ে গেলেন। মায়ের আশ্চর্য্য লীলা বড় কঠিন।
ফাল্গুন মাসে আসেন তিনি শংকট নাশিনী রূপ ধারন করে। এ সময় পৃথিবীতে নানা রোগ শোক দেখা দেয়। মা দুর্গা ভক্তকে সংকট থেকে মুক্ত করেন।
চৈত্র মাসে আসেন তিনি মহামায়া রূপে। ভক্ত সুরত রাজা সিংহাসন চ্যুত হয়ে মেধস মুনির আশ্রমে গিয়ে মুনির শরণাপন্ন হন। মুনি সব শুনে তাহাকে মহামায়া অর্থাৎ দুর্গাদেবীর আরাধনার পরামর্শ দেন। মুনির আদেশে তিন বছর মহামায়ার আরাধনা করে তিনি তাহার হারানো রাজ্য, স্ত্রী, পুত্র সকলই ফিরে পান।
জৈষ্ঠ মাসে মা দুর্গা ফলহারিনী রূপ ধারন করে মর্ত্যধামে আসেন। এ সময়ে পৃথিবীতে নানা ফলের প্রাচুয্য ঘটে। স্ত্রী লোকেরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় এ সময়ে সাবিত্রিব্রত পালন করেন।
আষাঢ় মাসে তিনি কামাখ্যা রূপ ধারন করেন। মা হন রজস্বলা আর আষাড়ের বৃষ্টি ফসলের মাঠ সিক্ত করে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে।
শ্রাবণে আসেন মা পার্বতী রূপে। তিনি শতাক্ষী রূপ ধারন করে শ্রাবণের বারিধারায় পলি বহন করে কৃষি ভূমিকে উর্বরা করে তুলেন। ভাদ্র মাসে আসেন শাকম্বরী রূপ ধারন করে। মাঠ-ঘাট শাক ও ফসলে ভরে উঠে। মানুষের মনে আসে তৃপ্তির জোয়ার।
এইভাবে মা দুর্গা শতরূপে মানব কল্যাণে দশ হস্ত প্রসারিত করে দশদিক পালন করেন। মায়ের চরনে আমাদের আকুল প্রার্থনা, তিনি আমাদের আসুরিক ভাব পরিহার করে শুদ্ধ ভক্তি দান করুন।
মহিষঘিœ মহামায়ে চামুন্ডে মুন্ডমালিনী।
আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহিদেবী নামোস্তুতে॥
ঘর পাপং, হর ক্লেশং, হর শোকং হরা শুভম।
ঘর রোগং হর ক্ষোভং হর দেবী হর প্রিয়ে॥
লেখক : অব: শিক্ষক