জননেতা মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে আমরা শোকাভিভূত

করোনা কালে প্রতিদিনই পরিচিত-অপরিচিত, প্রতিষ্ঠিত-অপ্রতিষ্ঠিত, গণ্য-নগণ্য; বহুজনের মৃত্যু সংবাদে আমরা ব্যথায় কাতর হচ্ছি। মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু অপ্রত্যাশিত সকল মৃত্যুই আমাদের কাছে অবাঞ্ছিত। শনিবার সকাল বেলায়ই হৃদয় ভাঙা শোক সংবাদটি পাওয়া গেল। জননেতা মোহাম্মদ নাসিম চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তিনি করোনাক্রান্ত ছিলেন, বয়সভারেও কিছুটা ন্যুব্জ ছিলেন। করোনার চিকিৎসাকালীন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় সংবিৎ হারান তিনি। সেই যে সংবিৎ হারালেন আর জাগলেন না। চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছুটা চেষ্টা করেছিলো। কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যু কে কিছুটা প্রলম্বিত করা গেছে কিন্তু রোধ করা যায়নি। অবশেষে ১৩ জুন সকাল ১১ টা ১০ মিনিটে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা হলো। দুনিয়ার সকল বাঁধন ছিন্ন করে, দীর্ঘ রাজনৈতিক পারিবারিক জীবনের যতিচিহ্ন টেনে মোহাম্মদ নাসিম চলে গেলেন পিছনে স্মৃতির ঝাঁপি ফেলে রেখে। তিনি ছিলেন রাজনীতির এক সবিশেষ মহিমাময় চরিত্র। যে অর্থে জননেতা বলা হয় সেই ধরণের রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি। মন্ত্রী এমপি আওয়ামী লীগ নেতা; এসব পরিচয়ই ম্লান হয়ে পড়ে তাঁর জননেতা পরিচয়ের আলোক উদ্ভাসের কাছে। নেতা এখন অনেক দেখা যায় কিন্তু জনতার নেতা তথা জননেতা আজ কই? অল্প যে ক’জন আছেন তাঁরাও একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। মোহাম্মদ নাসিমের মহাপ্রয়াণে আমরা শোকাহত, তাঁর ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।
আওয়ামী রাজনীতিতে মোহাম্মদ নাসিমের পিতা জাতীয় চার নেতার এক নেতা খ্যাত, ১৯৭৫ সনে কলংকিত জেল হত্যাকা-ে শহিদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর অবদান অপরিসীম। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর যে আওয়ামী নেতারা খুনী মোশতাকের সাথে হাত মিলাননি বরং হুমকি ও চাপ উপেক্ষা করে জীবনকে তুচ্ছ করার সাহস দেখাতে পেরেছিলেন ক্যাপ্টেন মনসুর ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসভাজন ছিলেন। পিতার আদর্শ অনুসরণ করেছেন সুযোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম। তিনি শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন। দুঃসময়ে তিনি বুক চিতিয়ে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে সামনে ছিলেন। প্রাজ্ঞতা দিয়ে দূরদর্শী পরামর্শ দিয়েছেন দলকে। নিজের লড়াকু চরিত্রে আকৃষ্ট হতেন অন্যান্য নেতা কর্মীরা। সরকারের আগের দুই মেয়াদে স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই মেয়াদে কোনো মন্ত্রীত্বের পদে না থাকলেও দলীয় ফোরাম ও ১৪ দলীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন অতিশয় দক্ষতায়। তাঁর অভাব আওয়ামী লীগ ও জোট দীর্ঘদিন অনুভব করবে।
মোহাম্মদ নাসিম ৭২ বছর বয়সে মারা গেছেন। পরিণত বয়স বলার মতো নয়। কিন্তু এই বয়সেই চলে যেতে হলো তাঁকে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, করোনার তীব্র মানসিক চাপে অথবা শরীরবৃত্তীয় কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় তাঁর। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। আলোচনা হয়েছিলো তাঁকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়ার। করোনা দুর্যোগে শেষ পর্যন্ত সেটি হয়ে উঠেনি। করোনা মহামারী আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটগুলোকে স্পষ্ট করেছে। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগগুলো কতটা দুর্বল ছিল তা বুঝা গেছে। দেশের বহু বিশিষ্টজনরা এই সময়ে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু অনেকেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। বিশিষ্টজনদের এই দুর্দশা দেখে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা উদ্যোগসমূহ কেমন অবস্থায় ছিলো তা কারও বুঝতে বাকি নেই। এমন ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ন্যূনতম জনস্বার্থ রক্ষাকারী অবস্থায় দেখার তাগিদ অনুভব করছেন সকলে। মোহাম্মদ নাসিম এমন এক দুর্যোগকালে মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর মৃত্যু থেকে কি শিক্ষণীয় কিছু রয়েছে?
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী বিদগ্ধ জননেতা মোহাম্মদ নাসিমের জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাই হলো তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সর্বোত্তম পন্থা। মহৎ ব্যক্তিদের পুরো জীবনকালই হয়ে উঠে অন্যদের পাঠ্যসূচি। দুর্ভাগ্য, আমরা স্তুতি বন্দনা করি কিন্তু জীবনাদর্শ গ্রহণ করি না। মোহাম্মদ নাসিমকে পাঠ করে যদি কিছু ব্যক্তিও নিজেকে গড়ে তুলেন তবেই সার্থকতা। আমরা তাঁর মহিমাময় জীবনদ্যুতির বিচ্ছুরণ কামনা করি।