জনপ্রতিনিধিদের দাবি অপরিকল্পিত, পাউবো বলছে সমীক্ষা শেষে হচ্ছে কাজ

বিশেষ প্রতিনিধি
ধর্মপাশায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি’র (জাইকা’র) অর্থায়নে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘রুই বিল প্রকল্প’র কাজ অপরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকল্পটি অপরিকল্পিত হচ্ছে দাবি করে ডিও লেটারও দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক বরাবরে। ডিও লেটারে তিনি প্রকল্পের বাঁধের স্থান সরিয়ে নদীর পাড়ে নেবার কথা উল্লেখ করেছেন। বুধবার সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘হাওরাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত সড়ক উন্নয়নে পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থার প্রভাব নিরূপণ’ বিষয়ক মতবিনিময় সভায়ও সংসদ সদস্য এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। তবে পাউবো’র দাবি সামগ্রিক সমীক্ষা কার্যক্রম শেষে এই প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে। এই নিয়ে দ্বিমত থাকলে আগেই উত্থাপন করা উচিৎ ছিলো। গত ২৫ মার্চ এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী সাইদুর রহমানসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন,‘মাননীয় সংসদ সদস্য কাজ বন্ধ রাখার কথা বলে বাঁধের স্থান সরানোর জন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’এর (আইডব্লিউএম’র) কনসালটেন্টকে অনুরোধ করলেও রাতে মুঠোফোনে তিনি জানিয়েছেন,‘যেদিকে কাজ চলছে, সেদিকেই চলতে থাকুক।’ অবশ্য সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এ ব্যাপারে বলেন,‘বাঁধের কাজ নদীর পাড় দিয়ে করার জন্য বলেছি, যাতে একসঙ্গে এই বাঁধ অনেক উপকারে আসে। তবে এবার যেটুকু কাজ হয়েছে, সেটুকু ড্রেসিংসহ শেষ করার অনুরোধ করেছি।’
জাইকা’র অর্থায়নে ধর্মপাশার রুই বিলে ধানের চাষাবাদ নিশ্চিত এবং মাছের অভয়াশ্রমের সুরক্ষার জন্য সামগ্রিক সমীক্ষা, সামাজিক মতবিনিময়, পরিবেশগত সমীক্ষা এবং ছাড়পত্র নেওয়ার পর উন্নত পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩৫ কিলোমিটার বেরী বাঁধ, ২ টি রেগুলেটর, ৪ টি কজওয়ে, ১ টি বক্স স্লুইসগেট এবং ১২ টি পাইপ স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে এই হাওরে ৬৬ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। ৩ বছরে বাস্তবায়ন হবে এই প্রকল্পের কাজ। প্রথম বছরের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ শেষ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকা জয়শ্রী’র ইউপি চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন,‘বাস্তবতার ভিত্তিতে এই বাঁধটি হচ্ছে না। গত ২৫ মার্চ এই বাঁধ ঘুরে আমাদের মনে হয়েছে, বাঁধের কোন একটি অংশ ভাঙলে ৩ টি উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন,‘এই প্রকল্পের আওতায় মধ্যনগর থেকে টুকেরবাজার বেরীবাঁধ কাম সড়ক হবার কথা। গোলাইখালী পয়েন্ট হতে শালদিঘা হাওরের মধ্য দিয়ে ফারুকনগর-বিছনাকান্দি পর্যন্ত কাজ হয়েছে। এই অংশটুকু গত ২৫ মার্চ মাননীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, আইডব্লিউএম’এর প্রধান কনসালটেন্ট সাঈদুর রহমানসহ আমরা সরেজমিনে দেখে মনে হয়েছে এটি ভুল স্থানে করা হচ্ছে। একারণে হাওরের জমি নষ্ট হরে এবং পুরো হাওর বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হবে।’ তাঁর মতে সোমেশ্বরি-গোমাই নদীর পাড় দিয়ে বেরী বাঁধ হলে জমি নষ্ট হবে না। অর্থেরও সাশ্রয় হবে।’ জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী কাজটি হলে ভাল হয় বলে মন্তব্য করেন এই জনপ্রতিনিধি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘রাজাপুর থেকে মধ্যনগর বাজার পর্যন্ত নদীর পাড় দিয়ে বাঁধ হলে জমি কম নষ্ট হবে। নদীর পাড় থেকে ৫০ মিটার দূরত্বে বাঁধ দিলে জমি অধিগ্রহণেরও প্রয়োজন পড়বে না। জলজ প্রাণীর বিচরণে সুবিধা হবে। বিলগুলোকে খনন করতে হবে। এছাড়া নদী খননের মাটি বাঁধে দিলে নদীর গভীরতা বাড়বে। বাঁধের মাটি নিয়েও চিন্তা করতে হবে না। আমার বক্তব্যের সঙ্গে আইডব্লিউএম’এর প্রধান কনসালটেন্টও একমত হয়েছেন।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক বলেন,‘সকল প্রকার সমীক্ষা ও সামাজিক মতবিনিময় শেষে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেবার পর এই প্রকল্পটি একনেক’এ অনুমোদিত হয়েছে। এই ধরনের পরামর্শ আগে দেওয়া উচিৎ ছিল। এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। মাননীয় সংসদ সদস্য ডিও লেটার দিয়ে বাঁধের বর্তমান স্থান বদল করার কথা লিখেছেন। গত ২৫ মার্চ প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী (আইডব্লিউএম’এর) কনসালটেন্ট সাঈদুর রহমানকে নিয়ে সংসদ সদস্য কাজের এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁর (সংসদ সদস্য মহোদয়ের) পরামর্শ মূল পরিকল্পনাকারী প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে উত্থাপনও করবেন। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে মাননীয় সংসদ সদস্য মুঠোফোনে আমাকে বলেছেন, এখন যেভাবে হচ্ছে সেভাবেই কাজ করার জন্য।’
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এ প্রসঙ্গে বলেন,‘আমি বলেছি যেহেতু প্রথম বছরের কাজ ৭০ ভাগ প্রায় শেষ তাই এখন মাটি ড্রেসিংসহ অন্য কাজ শেষ করার জন্য। পরের বছর থেকে নদীর পাড় দিয়েই কাজ করতে হবে।