- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - http://sunamganjerkhobor.com -

জনপ্রিয় দাবির অসফল হরতাল ও রাজনীতির বন্ধ্যাত্ব

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা অর্ধ দিবসের হরতাল কর্মসূচী তেমন কোন সাড়া জাগাতে পারেনি। বাম জোট জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে এই হরতাল কর্মসূচী ঘোষণা করেছিল। সাধ্যমত তারা হরতালের সমর্থনে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছিল। এই হরতালে বিএনপি নামক বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল সমর্থন জানিয়েছিল। তার পরও হরতাল কর্মসূচীটি সফল হতে পারেনি। অবশ্য বাম জোটের ডাকা অতীতের হরতাল কর্মসূচীগুলোও এমন ব্যর্থ কর্মসূচীতে পরিণত হতে দেখেছি আমরা। সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয়, যে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বাম জোট কর্মসূচী ঘোষণা করে সেই জনগণই এতে নির্লিপ্ত থাকে ভীষণভাবে। এ থেকে অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণের রয়েছে।
বাম জোটের ডাকা হরতাল সফল হয় না কেন? মোটাদাগে এর কিছু উত্তর রয়েছে। হরতাল সফল করার যেসব উপাদান আমাদের মত দেশে স্বীকৃত রীতি হয়ে পড়েছে বাম জোট কখনও সেগুলোর চর্চা করতে শিখেনি। এর অন্যতম হলো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষকে হরতাল মানতে বাধ্য করা। প্রচলিত বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অতীতের হরতাল কর্মসূচীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হরতালের আগের রাতে কিছু গাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে কিংবা বোমা-পটকার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতংক ছড়ানো হতো। হরতালের দিন পিকেটাররা থাকতো মারমুখী ও সহিংস। মানুষ ভয়েই হরতাল পালন করতে বাধ্য হতো। রাজনৈতিক শিক্ষার কারণেই বাম জোট এমন প্রক্রিয়ায় যেতে পারে না। বাম জোট যেটি করে তা হলো মানুষকে তারা বুঝায় কেন এই হরতাল। যেহেতু তাদের কর্মসূচীর পিছনে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংক্রান্ত দাবি-দাওয়া থাকে সেহেতু তারা সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানায় স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করতে। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষ তাতেও কর্ণপাত করে না। যানবাহন, কল-কারখানা প্রভৃতি বন্ধ রাখার পিছনে রাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা বড়। এখন বিভিন্ন সেক্টরের সিবিএ ও নিয়ন্ত্রক শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রধানত বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয়। তাই হরতাল কালে গাড়ি বা কল-কারখানা বন্ধ রাখার ব্যাপারে তারও উদাসীন থাকে, বরং এই হরতাল সফল না হতে তারা তৎপর থাকে। হরতাল সফল করতে না পারার পশ্চাৎকারণ হিসাবে তাই বামজোটভূক্ত দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতার পরিচয় ফুটে উঠে। সাধারণ মানুষের মাঝে বাম রাজনীতিবিদদের আগের গ্রহণযোগ্যতা এখন আর নেই। বাম দলগুলোকে নিজেদের মহৎ আদর্শের সমর্থনে সাধারণ মানুষকে একত্রিত করতেও তেমন কোন পরিকল্পিত কর্মসূচী নিয়ে এগোতে দেখা যায় না। কথিত বাম রাজনীতির প্রধান ধারাটি এখন শৌখিন রাজনীতি চর্চার মত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে সমাজে প্রচ- রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব তৈরি হয়েছে। এই ধরনের রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্যই অমঙ্গলজনক।
জনগণ ও আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে সেটিই মূলত প্রধান অন্তরায়। এই দূরত্ব কমিয়ে আনা না গেলে আদর্শিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আজ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির মতো একটি জনপ্রিয় দাবিতে দেয়া কর্মসূচীটি দৃশ্যত কেউ গ্রাহ্য করল না। তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার সমস্যা নিয়ে কে কথা বলবে? এই যে ধানের দাম নেই, খাদ্যগুদামে কৃষক ধান বিক্রি করতে পারছে না, চিকিৎসা ব্যয় সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে; এইসব বিষয় নিয়ে কে কথা বলবে? রাজনীতিতে অবশ্যই এমন একটি জায়গা থাকতে হবে যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের ভরসা খুঁজে পায়। আর বাম রাজনীতিই সে জায়গা, ঐতিহাসিকভাবে এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং মানুষের মনে কীভাবে জায়গা করে নিতে হবে সেই পথ বাম রাজনীতিকেই খুঁজে নিতে হবে।