জন গণতন্ত্র’র পথিকৃৎ ‘মানিক স্যার’

গাণ্ডীব জ্ঞানাঙ্কুর
আমাদের সমাজের ধারাই তো পাহাড়ি ঢলের মতো নামের পেছনে ছোটা; কিন্তু আমার বাবা (মানিক লাল রায়, যিনি ‘মানিক স্যার’ নামেই সমধিক পরিচিত) ছিলেন ঠিক তার বিপরীত। হয়তো তাঁর রক্তের ধারায় সাধারণে অসাধারণভাবে মিশে যাওয়াই ছিল সহজাত এক প্রবৃত্তি। তিনি কখনো নাম চান নি, খ্যাতি চান নি, চান নি বাড়ি-গাড়ি কিংবা সুউচ্চ দালানকোঠা। তিনি চেয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যে যুদ্ধ শান্তির বারতা নিয়ে আসবে; যে যুদ্ধ কৃষকের অধিকার ফিরিয়ে দিবে, ফিরিয়ে দিবে তাদের জমির মালিকানা; যে যুদ্ধ শ্রমিক-মজুরের শ্রমের প্রাপ্য ছিনিয়ে আনবে; যে যুদ্ধ নারী-পুরুষ-এর সমতা নিয়ে আসবে; যে যুদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক মুক্তি দিবে; সাম্যবাদী ‘মানিক স্যার’ সেই যুদ্ধই চেয়েছিলেন। তাই কবিতা লিখেছিলেন
‘যুদ্ধ, শান্তি এবং যুদ্ধ’
(বাজারে চালের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ /কী করে কাটাই বলো বছরের শেষ দিনগুলো /দ্রব্যমূল্যের ঘোড়া ছুটছে ঊর্ধশ্বাসে/অনুন্নত দেশের উপর /বেপরোয়া সহিস এক মেতেছে খেলায়/থামাতে চায় না ঘোড়া /বরং পিষ্ট করে দিতে চায় আমাদের ভাঙ্গা পাঁজর/
আমরা তো নিরীহ গোবেচারা শান্তিপ্রিয়/বাড়াই না কালো হাত সা¤্রাজ্যবাদের মতো কিংবা/উড়াই না বিজয়ের ঘুড়ি বিজিত দেশের উপর /কিন্তু তোমরা আজ কোন সাহসে /অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছো পা-বের মতো /আমার দেশের ভেতর/
এ সাহস তোমাকে কে দিলো? /তুমি কি জানো না/ তোমার অশ্বটাকে কেড়ে নেবো /রেখে দেবো অশ্বালয়ে/ এ আমার অহংকার নয় বরং জাতীয় পৌরুষ /তোমার অহংকারে করবে আঘাত /বরুবাহনের মতোই হত্যা করবো পা-ুর তৃতীয় ঔরষ।/ জানি এর পরিণতি যুদ্ধ ছাড়া কিছুই নয় /কিছুই হতে পারে না /তাই বলে আমি ভীরু কাপুরুষ নই/ তোমার অশ্বটাকে নির্বিচারে আমার দেশের ভেতর /বিচরণ করতে দিতে পারি না/
তাই তুমিও ক্ষেপে যাবে উন্মাদের মতো /তোমার বিভৎস রূপ দেখে চমকে উঠবে পৃথিবীর মানুষ/ আর এ নিদারুণ যুদ্ধ শেষে এ পৃথিবীতে/ নেমে আসবে শান্তির অমেয় ধারা।)। কবিতাটি ‘সুনামগঞ্জের কবিতা’ জাকির ইবনে সোলায়মান সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত।
তিনি ছিলেন খুবই সরল বিশ্বাসী। ব্যাক্তিগত কিংবা পারিবারিক জীবনে, যখন যে তাঁর কাছে এসেছে, সাহায্য, ধার চেয়েছে– সাধ্যাতীত করেছেন। বিশ্বাস করে বারবার ঠকেছেন, খুব কম মানুষ-ই বিশ্বাসের মূল্য দিয়েছে। অথচ তিনি কখনো বিশ্বাস না করার কাছে হার মানেন নি! যেন তাঁর কাছে মানুষ আসবে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য, আর বেলাশেষে ভুলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক! এখন বুঝি, এ সব-ই তাঁর সাধারণের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসার কারণ। আমি যদিও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা- দেখিনি, তবু যতটুকু সামাজিক কর্মকান্ড দেখেছি, তাঁকে দেখেছি অন্যায়ের প্রতিবাদী মূর্ত প্রতীকরূপে। সুনামগঞ্জের অনেক অন্যায় কর্মকা- তাঁর উদ্যোগে বন্ধ হয়েছিলো, যদিও তা ছিল জীবনের হুমকি স্বরূপ। তবুও কখনোই পিছপা হোননি।
তিনি ভাসান পানি আন্দোলনে যে দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়েছেন, নিজের জমিতে বন্যার ভাসান পানিতে কৃষক-জেলের মাছ ধরার অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং ইজারাদারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করানোর মাধ্যমে– মানুষ নিশ্চয়ই তা অনেক দিন মনে রাখবে। তিনি ছিলেন শিক্ষকতা পেশায় ভিন্নতর এক নাম। শুধু বর্তমান প্রেক্ষাপট নয়, তখনকার সময়েরও ছিলেন বিপরীত। বর্তমান সময়ে প্রাইভেট, কোচিং করানোর জন্য ব্যানার টাঙ্গানো হয় আর বাবা সেই সময়ে ‘ফ্রি কোচিং সেন্টার’ ও ‘বিনা বেতনে পড়ানো হবে’ এর জন্য লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে সুনামগঞ্জবাসীকে অবগত করতেন। এটা কেবল একজন আদর্শবান শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব। আমি তো বাবার কাছে অংক, ইংরেজি পড়া ছাড়া আনন্দই পেতাম না। এত সহজ করে পড়াতেন বাবা। অংক তো বাবা নিজে সহজ সমাধান করে অনুশীলন করাতেন। অথচ এখানকার কত শিক্ষক গাইডবই ছাড়া অংকের প্রশ্ন-ই করতে পারেন না! আর ইংরেজির শুরুটাই হতো বাবার নিয়মে টেনস এর গঠন এবং প্রয়োগ শেখার মধ্য দিয়ে।
সেই সোচ্চার বাবা একসময় এত নীরব হলেন কেন? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে। তাঁর এই দর্শন উদঘাটিত হলে, সকল আদর্শবান, সৎ রাজনীতিকের উপকারে আসবে বলে বিশ্বাস করি। আমি নিজে বাবাকে শতবার জিজ্ঞেস করেছি আগেকার সেই ঘটনাগুলো বলতে, খুব জানতে চাইতাম বাবার সেই সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে, জানতে চাইতাম কেন-ই বা রাজনীতি থেকে হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নিলেন; না, আমি তার কিছুই জানতে পারি নি! যে বাবা নিজের সন্তানের কাছেও নিজেকে প্রকাশ করেন না, তিনি কিভাবে চাইবেন সস্তা জনপ্রিয়তা! তাই বুঝি কেন তিনি জাতীয় নেতা হতে চান নি। অথচ জাতীয় নেতাদের চেয়ে কি কম কিছু ছিলেন? আমি যতটুকু জেনেছি তা মা, বড় ভাই অপূর্ব অনির্বাণ’র মুখে। তবুও কিছুই জানা হয় নি।
তিনি সমাজতন্ত্র চেয়েছিলেন। কিন্তু গোপন কোন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নয়। তিনি যে জন¯্রােত তৈরি করেছিলেন এবং তাদের শক্তিতে অবিরত ছিলেন, তা দিয়েই প্রকাশ্য রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের দ্বারা বিপ্লব সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর জনপ্রিয় গানের শেষ লাইনে বলেছেন ‘জন গণতন্ত্র’। তাঁর জনপ্রিয় গানটি উদ্ধৃত করছি
‘কাস্তে চালাও লাঙ্গল চালাও/চালাও কলের চাকা কৃষক তুমি ক্ষেতের মালিক /শ্রমিক কলের রাজা (লেফট রাইট লেফট)
কৃষক তুমি নাইরে জমিন /তুমি সর্বহারা
শ্রমিক তুমি শ্রমের মালিক /তুমি দিশেহারা।
কোথায় গেল তোমার জমিন /কোথায় হালের গরু তোমার ঘরে ভাত নাই কেন /কি কাজ করবে শুরু? শ্রমিক তোমার শ্রমের মূল্য /দেয়না কেন মিলমালিক ক্যামনে তুমি করবে আদায় /শ্রমের মূল্য সঠিক। তোমার শত্রু সা¤্রাজ্যবাদ /আর যত মিলমালিক তোমার শ্রমকে শোষণ করে /গড়ছে দালান কোঠা ঠিক।
সা¤্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ /মুৎসুদ্দী পুঁজির চক্র
শোষণ তোমায় করছে তারা /হতেই হবে বক্র।
কৃষক তুমি গড়ে তোল /সর্বহারার কৃষক দল
শ্রমিক তুমি গড়ে তোল /সর্বহারার শ্রমিক দল।
তোমার মুক্তি তুমিই আনবে /হতেই হবে শক্ত
মিত্র চিনে আনতে হবে /জন গণতন্ত্র।’

তিনি জীবনযুদ্ধে পরাজিত হলেও, নীতি-আদর্শে কখনোই পরাজিত হোননি। বিনে পয়সায় ছাত্র পড়াতে আর গণমানুষের রাজনীতি করতে গিয়ে যত চা-সিগারেট খেয়েছেন, ততই জীবনটা তিলে তিলে ক্ষয় হয়েছে। একের পর এক দাঁত ক্ষয় হয়েছে, বিভিন্ন রোগের জন্ম হয়েছে শরীরে। শত কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু মুখ ফুটে কখনো বলতে শুনিনি ‘আমার কষ্ট হচ্ছে’। অথচ কত হাড় ভাঙা কষ্ট হৃদয়ে চেপে নীরবে চলে গেলেন, আমরা কিছু না বোঝার আগেই! আসলে ভাবতেই পারিনি বাবা কখনো শ্রাবণের নক্ষত্র হয়ে পাড়ি জমাবেন দূরবাসে! মেঘ আর কখনো তাদের মাটির নক্ষত্রকে বৃষ্টির পরশে ছুঁতে পারবে না, তাই দাহ শেষে তাঁর ছাই যেন বর্ষার বৃষ্টি দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সুরমার জলে; যে জলে লিখা আছে ভাসান পানির উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম!
লেখক: সম্মান চতুর্থ বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।