জমিতেই পচছে টমেটো

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
ফলনকৃত টমেটো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের চাষীরা। সুনামগঞ্জের পাইকারী বাজারে ৮০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে টমেটো। এ কারণে টমেটো নিয়ে বাজাওে যাচ্ছেন না চাষীরা। ফলনকৃত টমেটো এখন পচে গলে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে। ক্ষেত থেকে উত্তোলন করতে গিয়ে শ্রম, ঘাম ও পরিবহন খরচ বাবদ যে ব্যয় হচ্ছে সে খরচই উঠছে না চাষীদের। এ কারণে ক্ষেতেই পড়ে থাকছে পরিশ্রম করে ফলানো টমেটো। কেউ আবার তুলে পাইকারী বাজারে নিয়ে আসলেও তা বিক্রি করতে না পাশের নদীর তীরে ফেলে যাচ্ছেন। এতে লাভবান হওয়া দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠছেনা বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
সুনামগঞ্জের টমেটো প্রধান অঞ্চল জামালগঞ্জের মান্নানঘাট। প্রতি বছর এখানকার টমেটো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। সস ও জুস তৈরির এই মূল্যবান কাঁচামাল এখন জমিসহ নদীর তীরেই পচে নষ্ট হচ্ছে। প্রচুর ভিটামিনসমৃদ্ধ টমেটো একসময় ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। টমেটো উৎপাদনের অঞ্চল মান্নানঘাটে মওজুদ রাখার কোন সুবিধা না থাকায় শত শত মণ টমেটো এখন ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মান্নানঘাট পাইকারী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ঠেলাগাড়িতে করে কৃষকেরা টমেটো ও করলা নিয়ে আসছেন বাজারে। পরে সেগুলো মেপে নৌকায় তোলা হচ্ছে। ৩০ টাকা কেজি দরে করলা বিক্রি হলেও টমেটো বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই টাকা কেজি দরে। অনেক ক্ষেত্রে অবিক্রিত টমেটো নদীর তীরে ফেলে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন কৃষক। শ্রমে ঘামে আবাদ করা টমেটো বিক্রি করতে না পারায় চাষীদের মুখে হতাশার চাপ।
টমেটো চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত টমেটো বিক্রয়ের মাধ্যমে মান্নানঘাট বাজারের উৎপত্তি হয়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত টমেটো ও অন্যান্য সব সবজি পাইকাররা এখান থেকে কিনে নৌকাযোগে ঢাকা, সিলেট, ভৈরব, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান।
জামালগঞ্জ উপজেলার রামপুর, কাশিপুর, শরীফপুর, চাঁনপুর, সংবাদপুরের কয়েক হাজার কৃষকের আবাদকৃত বিভিন্ন জাতের সবজি মান্নানঘাট পাইকারী বাজারে বিক্রি হয় বহু বছর ধরে। এর মধ্যে টমেটো, করলা, লাউ, শিম অন্যতম। এবছর বেশি লাভের আশায় টমেটো চাষে ঝুঁকে পড়েন এখানকার কৃষকেরা। ফলন সন্তোষজনক হলেও বিক্রিতে উত্তোলনের খরচই উঠছে না। প্রথম পর্যায়ে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পারলেও এখন ২ টাকায় এসে ঠেকেছে টমেটোর দর। এতে চাষীরা হতাশায় পড়েছেন।
কাশিরপুর গ্রামের কৃষক মনির উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রায় ১ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। এতে তার খরচ হয়েছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। আর বিক্রি করেছেন মাত্র ১০ থেকে ১১ হাজার টাকার টমেটো। তাতে উৎপাদন খরচের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। টমেটো চাষ করতে গিয়ে মাইট্টা সার, লাল সার, জীপসাম, কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছে তাকে। পরিচর্যার দেড় মাসের মাথায় ফলন হয়েছে। কিন্তু ফলন ভালো হলেও বাজারে এসে বিপাকে পড়েছেন তারা।
কাশিপুর গুচ্ছগ্রামের কৃষক মো. হারিছ মিয়া বলেন, এইবার সবজির দাম এক্কেবারে কম। ২ টাকা আড়াই টাক দরে টমেটো বিক্রি করছি। ১ বিঘা জমি করে এইবার টমেটো বিক্রি করছি মাত্র ৪৫ হাজার টাকার। গত বছর এই জমিনেই টমেটো ও লাউ বিক্রি করছিলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার। এই বছর খুব লস হইছে।


কাশিপুর গ্রামের আরেক টমেটো চাষী ইয়ার আলী জানিয়েছেন, এইবার তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। এতে ব্যয় হয়েছে ৬০ হাজার টাকার উপরে। কিন্তু টমেটো বিক্রি করছেন মাত্র এক লাখ টাকারও কম। গত বছর একই জমিতে প্রায় ২ লাখ টাকার উপরে টমেটো বিক্রি করেছেন তিনি। তাদের আবাদকৃত টমেটো বেশিদিন মওজুদ রাখতে এ এলাকায় কোলেস্টর স্থাপনসহ সরকারি ঋণ ও সার-বীজ সুবিধা প্রাপ্তির দাবি জানালেন তিনি।
মান্নানঘাট বাজারের টমেটো আড়ৎদার সালাম মিয়া ও শহীদ মিয়া জানিয়েছেন, টমেটো এখন ২ টাকা দরে ক্রয় করছেন তারা। বর্তমানে টমেটোর তেমন চাহিদা নেই। তাই দাম কম। প্রতিদিনই কৃষক প্রচুর টমেটো বাজারে নিয়ে আসছেন। কিন্তু দাম কম হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করছেন। আমরাও বিপদে আছি। লোকসান দিতে দিতে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি আড়ৎদাররা।
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাশরেফুল আলম বলেন, কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এগুলো সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করা যেতে পারে। তবে হিমাগার স্থাপনে আপাততঃ কৃষি বিভাগের কোন কার্যক্রম নেই।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বললেন, একই জাতের সবজী, একই সময়ে বেশি ফলন হলে বাজারে মূল্য কমে যায়। টমেটোর ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে। কৃষকরা ফলন করেছেন বেশি। এছাড়া টমেটো নির্ভর শিল্প কারখানাও ভাটি অঞ্চলে নেই। মান্নানঘাটের সঙ্গে নৌপথের সহজলভ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ওখানে ছোট ছোট শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে উদ্যেক্তারা এগিয়ে আসলে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় অবশ্যই সহযোগিতা করবে।