জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার/ লোক দেখানো উদ্যোগ নয় কার্যকর পদক্ষেপ চাই

আইনে নিষিদ্ধ মাছ ধরার অবৈধ জাল ধরে ধ্বংস করার খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এসব খবর ছাপানোতে মৎস্য অফিসের সবিশেষ আগ্রহ। তারা প্রেসবিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে, গণমাধ্যমকর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এসব খবর প্রচারে বেশ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। দেশের অমূল্য মৎস্যসম্পদের সুরক্ষার অভিপ্রায় থেকে গণমাধ্যম এসব খবর প্রকাশে কখনও অনাগ্রহ বোধ করে না। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযান বা নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস করার বিষয়টি যে কেবলই লোক দেখানো রুটিনওয়ার্ক মাত্র সে কথাও সত্য। অফিসের ফাইল ঠিক রাখতে মাঝেমধ্যে এরকম মিলমিশের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানের ফলে জলাশয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল বা এ জাতীয় অন্যান্য জিনিসের ব্যবহার কমেছে বলে ন্যূনতম ধারণা পাওয়া যায় না। বরং সর্বত্র মাছ ধরার নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহারের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা লক্ষ করা যায়। ফলে আমাদের মিঠাপানির মাছ সমূলে ধ্বংস হয়ে চলেছে। এজন্য কারও কোন হায় আফসোস নেই। অদ্ভুত নির্লিপ্ততার মধ্য দিয়ে এই নিধনযজ্ঞ অবলোকন করে চলার নির্মম বাস্তবতা প্রকট।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জামালগঞ্জের জলাশয়ে চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারের উপর একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, এই জাল ব্যবহারের প্রবণতা অপ্রতিরোধ্য। চায়না দুয়ারি জাল নামটি আমরা নতুন শুনলাম। আগে কারেন্ট জাল, ফাঁস জাল ইত্যাদি নাম শোনা যেত। চায়না দুয়ারি জাল নাকি আগের যেকোনো ধরনের জালের চাইতেও বেশি মৎস্যবিধ্বংসী। এসব জাল সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় অবৈধ মৎস্যশিকারীদের নিকট এর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। এই জাল জলাশয়ের ছোটবড় মাছই কেবল সমূলে ধরে আনে না বরং জলাশয়ের অন্যান্য প্রাণপ্রকৃতিও সমানভাবে ধরে নিয়ে আসে। জলাশয়ের কাঁকড়া, ব্যাঙ, শামুক, কুইচ্চা প্রভৃতি জলজ প্রাণীও এসব জালে ব্যাপকভাবে ধরা পড়ে। এছাড়া চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার শেষে যখন রোদে শুকাতে দেয়া হয় তখন তাতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আটকা পড়ে। সবদিক দিয়ে এই জালটি বিধ্বংসী চরিত্রের। হাওরাঞ্চলের জলাশয় থেকে প্রায় ২৮ জাতের মাছের বংশের বিলুপ্তি ঘটেছে। এই বিলুপ্তির পিছনে এসব নিষিদ্ধ জালের ব্যাপক ভূমিকা থাকা সত্বেও মাছের যম হিসাবে বিবেচিত এই জাল প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বলে স্থানীয় জনসাধারণের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
মৎস্যবিভাগ নিজেদের জনবল সংকটের কথা এবং এই কাজ একটি বিভাগের দ্বারা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে নিজেদের দায় ঢাকতে চায়। কিন্তু নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে যতটুকু কাজ করা সম্ভব ততটুকু তারা করেন কিনা সেই হিসাব দেন না। কারেন্টের জাল বা এজাতীয় বস্তু কেবল নির্দিষ্ট কিছু মৎস্য শিকারীই ব্যবহার করেন। কারা এসব নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহার করেন তা মৎস্য বিভাগের জানার বাইরে থাকার কথা নয়। তারা আন্তরিকভাবে চাইলে এইসব জাল ব্যবহারকে বন্ধ অথবা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না এমন কথা কেউ বিশ্বাস করেন না। মৎস্যবিভাগ নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে অপরাপর বিভাগীয় ও সামাজিক উদ্যোগগুলোও অনেক শক্তিশালী রূপে দেখা যেত ।
মিঠা পানির মাছ সংরক্ষণ বিষয়টিকে কেন জানি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না। বরং চাষের মাছ উৎপাদন বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিতে দেখি আমরা। এই ভুলের কারণে আমাদের মিঠা পানির মাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে কৃষিজ ক্ষেত্রের অন্যান্য উপাদানের মতই মৎস্যসম্পদও কর্পোরেট পুঁজির দাসে পরিণত হতে চলেছে। এই সর্বনাশা পরিণতি অবশ্যই রুখতে হবে। তাই মিঠা পানির মাছের জন্য ক্ষতিকর এইসব নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহার বন্ধে আমরা মৎস্য বিভাগের সক্রিয় ও কার্যকর উদ্যোগ কামনা করি।