জল-জলাশয়ের দেশে মাছের আকাল

জলমহাল শুকিয়ে মাছ আহরণ করা আইনত নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসক জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছেন। কিন্তু ইজারাদাররা সেই নিষেধাজ্ঞা বা আইনের বিধান মানছেন না। প্রতিবছরই ফালগুন-চৈত্র মাসে জলমহাল সেচযন্ত্র দিয়ে শুকিয়ে মাছ আহরণ করা হচ্ছে। এ বছরও এরকম প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ছাতক উপজেলার বিভিন্ন জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার উপর একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। উপজেলার কুইয়াদল জলমহাল ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কুড়া-চাতল, গর্জনী, জাহিদপুর পাচদিলা বিল, বলের হাওর, সনাইবিল প্রভৃতিতে শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে বলে ওই সংবাদ থেকে জানা যায়। বিল শুকানোর ফলে এলাকার বোরো জমিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কুইয়াদল বিল শুকানোর বিরুদ্ধে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পাননি। বলাবাহুল্য জেলার সর্বত্রই এই অবস্থা বিরাজমান। শুধু স্বীকৃত জলমহাল নয়, খাল, নালা, ডোবা প্রভৃতিতেও ব্যাপকভাবে সেচযন্ত্র লাগিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে বলে জানা যায়। অব্যাহতভাবে এই ধরনের কাজ বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকলেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপিত হলে পরিদর্শন, তদন্ত, প্রতিবেদন ইত্যাদির মারপ্যাঁচে জলাশয় শুকানোর কাজটি নির্বিঘেœ শেষ করে ফেলা হয়। এতে যে শুধু মাছের বংশবিস্তারই রোধ হচ্ছে তাই নয় বরং এতে পরিবেশ প্রতিবেশ বিপর্যয়সহ বোরো চাষাবাদে ব্যাপক অন্তরায় তৈরি করে। সরকারের উচিত এই বিষয়ে মনোযোগ দেয়া।
প্রতি উপজেলায় মৎস্য অফিস রয়েছে। এসব কাজ দেখার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু এই বিভাগটি মৎস্য সংরক্ষণে আসলে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে সেটি এক বড় প্রশ্ন। অবশ্য তাদের কাজ করার ক্ষমতাও সীমিত। কোনো জলাশয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা তাদের নেই। তারা এজন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের উপর নির্ভরশীল। উপরন্তু মৎস্য বিভাগের জনবল সংকটও চোখে পড়ার মত। সবকিছু মিলিয়ে জেলার জলমহালগুলো কার্যত একশ্রেণির মৎস্য ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় পরিণত হয়েছে। আইনের লঙ্ঘনকে ঠেকাতে হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন। মৎস্য নিরাপত্তা বিধান তথা জলমহালে অবৈধ মাছ শিকারের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব যখন মৎস্য অধিদপ্তরের তখন অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় কিছু ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে যাতে তারা নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
দেশীয় প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি ঘটতে চলেছে। এই জাতীয় মাছের প্রজনন অনুকূল পরিবেশ আমরা বিনষ্ট করে ফেলছি। এখন যেভাবে খামারে মাছ উৎপাদনকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে সেইভাবে দেশীয় মাছের উৎসগুলো সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। বাঙালি ভাত-মাছ প্রিয়। দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ক্রমাগত কমতে থাকায় খাবারের সনাতন সংস্কৃতিটি এখন টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে। সচেতন ও দায়িত্ববোধপ্রবণ হলে এই সংকটাবস্থা আমাদের দেখতে হত না। এখানে ইজারাদাররা যেমন সর্বনাশা কাজ করছেন তেমনি সাধারণ জেলে-কৃষকরাও বিন্দুমাত্র দায়িত্ববোধ প্রদর্শন করেন না। সকল পক্ষই পূর্বাপর না ভেবে মাছের বংশ উজাড় করে দিতে অতিশয় তৎপর। আইনের শক্ত প্রয়োগ ঘটনো গেলে এই সর্বনাশা প্রবণতার রাশ কিছুটা হলেও টেনে ধরা যেত।
দেশী মাছের যে মন ভুলানো স্বাদ তা এখন অনেকের নিকট গল্পের মতো বিষয়। জল-জলাশয়ের দেশ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক উৎসের মাছের জন্য হাহাকার করবে এমন দুর্দশা দেখার কথা ছিল না। এখনও সময় আছে। সরকার যদি অনমনীয় থাকেন তাহলে মাছের পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু কথা হলো, সর্বগ্রাসী যে অনিয়ম বিশৃঙ্খলার সময় আমরা পার করছি সেখানে মৎস্য খাতের এই অরাজকতা দূর করবে কে?