জাতির অন্তর্গত ঐশ্বর্যই আমাদের অনুপ্রেরণা

জাত-পাত-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। শনিবার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আরও বলেন, কুপম-ুকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও পশ্চাদপদতা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বের উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারার সাথে তাল মিলাতে হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যেই তিনি কথাগুলো বলেছেন। শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের রাষ্ট্রকা-ারী। এঁদেরকে অবশ্যই আধুনিক বিশ্বের সাথে মানানসইভাবে তৈরি হতে হবে। নতুবা অন্য দেশগুলোর চাইতে আমরা পিছিয়ে থাকব অনেক অনেক। পরিকল্পনামন্ত্রী সঠিকভাবেই বর্তমান বৈশ্বিক সংকট অনুধাবন ও এ থেকে উত্তরণের পথ নির্দেশ করেছেন। এই পৃথিবীতে এখন অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই। যদি সত্যিই এই দেশটাকে আমরা পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে রাখতে চাই তবে অবশ্যই আমাদের যাবতীয় কূপম-ুকতা ও পশ্চাদপদ ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মন্ত্রী যখন অগ্রগতির সঠিক পথটি নির্দেশ করতে সক্ষম হয়েছেন সেই সময়ে আমরা দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এমন কিছু পরিস্থিতি অবলোকন করছি যা মন্ত্রী মহোদয়ের অভিপ্রায়ের ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। তথাকথিত ধর্মীয় উগ্রতা কিংবা বর্ণবাদের অন্ধত্ব এখন পৃথিবীর বহু দেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। উন্নয়নের কর্ণধার রূপে দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পাশের দেশ ভারতে ধর্মীয় জিগির রাজনীতিকে কলুষিত করে চলেছে এক দশক কাল ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ এখনও ধর্মীয় ভেদরেখা দ্বারা পরিচালিত হতে হতে মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছে। আধুনিকতার চূড়ান্ত বিকাশের এই সময়ে এসে কিছু গোষ্ঠী এখন ধর্মীয় উগ্রপন্থা আর নিরীহ মানুষের প্রাণ হরণের উন্মাদনায় নিয়োজিত রয়েছে। ধর্মীয় উগ্রপন্থার কারণে পৃথিবীর একদা সভ্যতা ও সমৃদ্ধিতে অগ্রসরমাণ বহু রাষ্ট্র আজ অকার্যকর ও মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এই যখন বৈশ্বিক বাস্তবতা তখন আমাদের বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পরিকল্পনামন্ত্রী সত্যিকারভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন মানবজাতির লড়াই-সংগ্রামের ফলে যে অগ্রগতির ধারা সেটিকে আরও বিকশিত ও উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়ার সঠিক কর্মপন্থা কী। এবং তিনি এইসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের উপদেশ প্রদান করেছেন, যে শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
ইতিহাস প্রমাণ দেয় বাংলাদেশ কখনও কোনো ধরনের উগ্রপন্থাকে পছন্দ করে না। এই দেশে বহিরাগত লুটেরা ও দখলকারীরা ক্ষমতার কারণে নানা সময়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। কিন্তু বিদেশি এইসব দখলদার লুটেরাদের অবিরাম সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর মাধ্যমে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার দীর্ঘ সময়েও সাধারণ মানুষ নিজেদের মন-মানসিকতাকে সহিষ্ণু ও উদার রাখতে সক্ষম হয়। সাধারণ মানুষের এই ঔদার্যবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সকলের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার সহজাত গুণাবলি এবং সহজ-সরল প্রকৃতির উদারতাই আমাদের মূল সম্পদ। এই সম্পদের গুণেই আমাদের দেশটি পাকিস্তান-আফগানিস্তান কিংবা সুদান হয়ে উঠেনি। জাতির এই অন্তর্গত ঐশ্বর্যই আমাদের অনুপ্রেরণা। মন্ত্রী মহোদয় এই জাতির সনাতন মনোজগত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তিনি এও জানেন কিছু দুর্বৃত্ত নিছক স্বার্থতাড়িত হয়ে সাময়িক লাভালাভের খায়েশ পূরণ করতে আমাদের এই ঐশ্বর্যভা-ারে হানা দেয়। এই হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখাটাই হলো সময়ের দাবি। আজ আমাদের চার পাশে যত অনাচার, ভ্রষ্টতা, দুর্নীতি, নিপীড়ন, অন্যায্যতা, অসমতা; এর সবকিছুই পশ্চাদপদ ও কূপম-ুক কিছু দুর্বৃত্তের আমদানি। এইসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া হলো জাতির সুমহান দায়িত্ব।
আমরা আর পিছনে ফিরে হতাশ হতে চাই না। আমরা কেবলই সম্মুখপানে এগোতে চাই। এগোতে চাই আমাদের ঐশ্বর্যকে সাথে নিয়ে বিশ্বকে রাঙিয়ে তোলতে। আর সরকারের একজন মন্ত্রী যখন জাত-পাত-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পশ্চাদপদতা, সাম্প্রদায়িকতা ও কূপম-ুকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান; তখন সত্যিই আমরা আশাবাদী হই।