জাতীয় পার্টির ভাঙনে রাজনীতির কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটবে না

জাতীয় পার্টির এই দফার ভাঙন অপরিহার্যই ছিল বলে মত বিশ্লেষকদের। জাতীয় পার্টিতে কখনও বিন্দুমাত্র গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল দলটি। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সেই একচ্ছত্র কর্তৃত্বের মালিক হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই দলটির ভাঙন নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এরশাদ রক্তের উত্তরাধিকার নিজের ছোট ভাইকে পার্টির ওসিয়ত দিয়ে গেলেও এরশাদ-পতœী রওশন যে এই ওসিয়ত মানবেন না সেটি পূর্ব অনুমিত ছিল। বৃহস্পতিবার বেগম রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই অনুমান বাস্তবতায় পর্যবসিত হলো। এখন থেকে জাতীয় পার্টি জিএম কাদেরের নেতৃত্বে এক অংশ এবং রওশন এরশাদের নেতৃত্বে আরেক অংশ পরিচালিত হবে। বলা বাহুল্য জাতীয় পার্টি নাম নিয়ে আরও দুইটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে যারা এরশাদের জীবিত থাকা অবস্থায়ই পার্টি ভেঙেছিলেন। সর্বশেষ ও এর আগের ভাঙনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, কোন আদর্শিক কারণ নয় বরং কর্তৃত্ব, স্বার্থ ও ক্ষমতার কারণেই এইসব ভাঙন ঘটেছে। বাংলাদেশে জাতীয় পার্টির মতো দলেরও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন আছে, যে দলের অভ্যন্তরে নেই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা। এমন অবস্থা থেকেই জাতীয় রাজনীতির অবস্থা বুঝা যায় ভালভাবে।
জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক দল হিসাবে কতটা কার্যকর ও সংহত থাকবে সেটি আবার ক্ষমতাসীন সরকারি দলের ইচ্ছানির্ভর। স্বয়ং এরশাদ জীবিত থাকতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। এইসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পিছনে সরকারি দলের অভিপ্রায় প্রাধান্য পেত আর এরশাদ দলের অস্তিত্ব তথা নিজের একটি রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে সরকারি অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতেন। এখনও অবস্থার হেরফের হয়নি। তাই জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের নেতৃত্বে এরশাদের জাতীয় পার্টি দ্ুিট টুকরো হলেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আনুকূল্য কারা পাবেন তার উপরই নির্ভর করবে কোন গ্রুপটি কার্যকর জাতীয় পার্টি হিসাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। দুই অংশই এখন সরকারি আনুকূল্য লাভের বিষয়ে পারষ্পরিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। ক্ষমতাসীন যেকোনো দলের জন্য প্রধান বিরোধী দলের এমন অবস্থা একেবারেই স্বস্তিজনক।
তবে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের এমন পরনির্ভরশীল অবস্থান জাতীয় রাজনীতির জন্য সুখকর নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এতে। জাতীয় স্বার্থে এইসব দল খুব বেশি উচ্চকণ্ঠ হতে পারে না। আর কে না জানে সংসদীয় গণতন্ত্রে কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে গণতান্ত্রিক চর্চা মুখ থুবড়ে পড়ে। এরশাদ নিজের শাসনামলে স্বৈরাচারের খেতাবে ভূষিত হলেও তিনি অনেক ভাল ভাল কাজ করেছিলেন। সেইসব ভাল কাজের কথা এখনও মানুষ স্মরণ করে। এইসব কাজের কারণেই জাতীয় পার্টির জনভিত্তি এখনও একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। কিন্তু এরশাদ নিজের নিরাপত্তা, প্রভাব ও স্বাচ্ছন্দ্য ভাবতে গিয়ে মূলত দলটির রাজনৈতিক চরিত্রকে দুর্বল করে দিয়েছেন। সেই দুর্বলতা দলটিকে আরও বহুদিন বয়ে বেড়াতে হবে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে জাতীয় পার্টি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হওয়ার কোন চেষ্টাই করছে না। সরকারি আনুকূল্য হ্রাস পেলেই দল হিসাবে জাতীয় পার্টির অবস্থান একেবারেই গৌণ হয়ে যাবে।
রওশন এরশাদের নেতৃত্বে পার্টির ভাঙনের পর এখন দলটি কীভাবে অগ্রসর হয় সেদিকে সকলের দৃষ্টি থাকবে। দৃষ্টি থাকবে ভাবী-দেবরের এই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকতে পারেন সেদিকে। তবে এই ভাঙনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন যে ঘটবে না এটি নিশ্চিত।