জাদুকাটার পাড় কাটার নিষেধাজ্ঞা একদিনেই বুমেরাং

ঘোষণাটা একদিনের মাথায়ই এমন বুমেরাং হয়ে যাবে আমরা ভাবিনি। অতীত অভিজ্ঞতায় আশাবাদী হওয়ার কথা না থাকলেও মানবিক প্রত্যাশায় সকলেই আশাবাদী হয়েছিলেন যে তাহিরপুরের জাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন করে সাধারণ শ্রমিকরা এখন জীবিকা চালাতে পারবেন কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়া। যেহেতু স্থানীয় সংসদ সদস্য নদীর পাড় কেটে বালু তোলার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা- ও চাঁদাবাজির বিষয়ে কঠোর মনোভাবের ঘোষণা দিয়েছেন সেহেতু একইসাথে ধারণা করা হয়েছিল এবার এই নদীটি আর দুর্বৃত্তদের আগ্রাসনে পড়বে না। কিন্তু হা হতোস্মি। সংসদ সদস্যের ঘোষণার একদিন পেরোতে না পেরোতেই দেখা গেল পূর্ববৎ জাদুকাটা নদীর পাড় কেটে বালু আহরণ করা হচ্ছে। তাহিরপুরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোমবার বিকালে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে নদীর পাড় কাটার অপরাধে দুই ব্যক্তিকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। অর্থাৎ প্রথম রাতেই বিড়াল দেখিয়ে দিল সে এখানে ভক্ষণ করতেই এসেছে, কোন দাতব্য উদ্দেশ্য তার ছিল না। এমত অবস্থায় হতাশা প্রকাশ ব্যতীত আমাদের আর করার কী আছে?
মানুষ সর্বাবস্থায় ভালোর প্রত্যাশী। চরম প্রতিকূল পরিবেশেও সে আশার আলো খোঁজে। মানুষের এ হলো সহজাত প্রবৃত্তি। জাদুকাটা নদী তীরে পরিবেশের বিপর্যয় এবং কোনো ধরনের চাঁদাবাজির বিস্তুৃতি না ঘটিয়ে বালু উত্তোলনের যে ঘোষণা শুনা গিয়েছিল দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখে, তাতে অতীতের যাবতীয় অপকর্মের দৃষ্টান্ত ভুলে গিয়ে আমরা শ্রমিক বান্ধব একটি পরিবেশের জন্য অপেক্ষমাণ ছিলাম। জেলার কয়েক হাজার শ্রমিক এইসব বালু-পাথর মহালের উপর নির্ভরশীল বংশানুক্রমে। তাদের রুটিরুজির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মহীন হওয়ার অসহনীয় সময়ে যখন ভাল কোনো কথা শুনা যায় তখন তাতে উদ্বেলিত হতে বাধা কোথায়? কিন্তু বাঙালি বারবার ঠকেও যে শিখে না, সে তার দোষ নয় বরং এ দোষ আমাদের সামাজিক উদ্যোগের। সামাজিক শক্তিবলয় মুখে এক কথা আর কাজে আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপনে এতটাই পারদর্শী যে সাধারণ মানুষকে বারংবার ঠকতেই হয়।
বালু ও পাথর কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সুনামগঞ্জের এক ধরনের দুর্নাম তৈরি হয়েছে সারা দেশে। পরিবেশ ধ্বংসকারী বোমা ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার, ছোট নদীতে বড় নৌযান প্রবেশ, নদীর পাড় কাটা প্রভৃতি কর্মকা-ের সাথে নৌপথে অসহনীয় চাঁদাবাজির যন্ত্রণা আজ সারা দেশে আলোচিত-সমালোচিত। জেলার বিভিন্ন নৌরুট ধরে বালু-পাথর পরিবহন করা হয় সারা দেশে। এইসব নৌরুটে নামে-বেনামে কিছু বৈধ কিছু অর্ধ বৈধ অধিকাংশ অবৈধ চাঁদাবাজি চলছে দেদারসে। রক্তি বা জাদুকাটা নদীতে বিআইডব্লিউটিএর কোন জেটি না থাকলেও তারা নদী ইজারা দেয়। যারা ইজারা নেয় তারা জমিদারের মতো চাঁদা আদায় করে। কেউ বেচাল হলে তাকে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠায়। এর বাইরে বিচিত্র সব নামে চলে চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজরা বেপরোয়া ও হিং¯্র। এদের হিং¯্রতার কারণে আজ সুর আর গানের দেশ সুনামগঞ্জের দুর্নাম চড়িয়ে পড়ছে বাইরে। এইসবের শেষ কোথায়?
আমরা জানতে পেরেছি নৌপথে চাঁদাবাজি তথা যেকোনো অপরাধ কর্মকা-ের বিরুদ্ধে জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার অতিশয় কঠোর বার্তা প্রদান করেছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সুপার স্বয়ং যখন অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান তখন অপরাধীরা কিছুটা হলেও নিবৃত্ত হতে বাধ্য। যদিও আমরা জানি সামাজিক বাস্তবতায় একজন পুলিশ সুপারের পক্ষে একা সকল অপরাধ দমন করা নিতান্তই অসম্ভব। এখানে আবারও পুনরুক্তি করি, ভাল কিছু শুনলেই আমরা উদ্বেলিত হই। কারণ ভালোটাই আমাদের কাম্য।