জামালগঞ্জে বানের পানিতে ভাসছে মানুষের ভাগ্য

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে জামালগঞ্জের চারপাশ। বানের পানিতে ভেসে গেছে পথঘাট হাটবাজার। ইতোমধ্যে জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ-সাচনা সংযোগ সড়কের একাংশ তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে মানুষের জীবনে। পানিবান্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। এ অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে চরম ভোগান্তির ¯শিকার হচ্ছেন বন্যা কবলিতরা। উপদ্রুত এলাায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পনির সংকট। এছাড়া গৃহপালিত পশু নিয়ে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বন্যার্তরা। বানে ভাসা নিরুপায় মানুষেরা সাহায্য সহযোগিতার আকুতি জানাচ্ছেন। উপদ্রুত এলাকা ঘুরে এমন জলমগ্ন অসহনীয় পরিস্থিতি দেখা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ৭০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানি প্রবাহ ৭.৮ মিটার হলে তাকে বিপদসীমা হিসাবে গন্য করা হয়। রবিবার সকালে সুরমার পানি প্রবাহের গতি বাড়ে ৮.৫ মিটার পর্যন্ত। এর আগেরদিন গতি ছিল ৮.১৫ মিটার। গতকাল সকালে সুরমার পানি বিপদসীমার ৭০ সে.মি পর্যন্ত গড়ালেও ঐ দিন দুপুরে ওে গতি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ পাউবো অফিস। ঐ দিন বৃষ্টি না থাকায় হয়তো পানি কিছুটা কমেছে। তবে বন্যা আরও প্রলম্বিত হওয়ার শংকা থেকেই যাচ্ছে। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ যে আরও বাড়তে তা নিশ্চিত।
বেহেলি ইউনিয়নের আরশিনগর গ্রামের মো. দিলোয়ার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ৪ শিশু সন্তানকে নিয়ে পানিবন্দি ঘরে বসে আছেন তিনি। পানিতে ভেসে গেছে তার ঘরবাড়ি। এ বন্যায় মা হারা সন্তানদের নিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন মো. দিলোয়ার।
তিনি বলেন, বউ মারা গেছে প্রায় দুই বছর হইয়া গেছে। এই ৪ বাচ্চারে লইয়া পনিতে ভাইসা যাচ্ছি। উঠানে পানি, ঘরেও পানি। বের হওয়ার কোন জায়গা নাই। এমনিতেই কাজ কাম নাই। এখন কি খাইমু, কেমনে চলমু।
সাচনাবাজার ইউনিয়নের হরিহরপুর (বাগহাঁটি) গ্রামের শামসুল হক বলেন, পানিতে আটকা পইড়া ঘরে বইসা আছি। চতুর্দিকে পানি। কোনানে যাইমু, কি করমু, কিছু বোঝতাছি না। করোনার লাইগা এমনিতেই বিপদ। এর মাঝে বন্যা আইছে। মরারে ্আরও মাইরা ফেলার উপক্রম হইছে। কোন সাহায্য সহযোগিতা না পাইলে আর বাঁচমু না।
বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের প্রজেশ দে বলেন, হাত, পাও ঠান্ডা হইয়া আইতাছে। নিজেও মরমু, পোলাপানও মরব। এই বন্যায় গরু আর মানুষ এক ঘরে বসত করতাছি। বিপদের উপর আরও বিপদ আইসা পড়ছে। কিভাবে বাঁচমু এই চিন্তায় জান বাঁচে না। আমরারে বাঁচাইতে সরকারি সাহায্য খুব দরকার।
কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সহ সভাপতি মো. আলী আমজাদ বলেন, বন্যার পানি আমার ঘরেও প্রবেশ করেছে। এর যন্ত্রণা কতটা কঠিন সেটা আমার চেয়ে বেশী অনুধাবন করছে সাধারণ মানুষ। এই পানিতে তলিয়ে গেছে অনেকের বাড়িঘর। যাদের ঘরে আগুন জ¦ালানোর মতো একটা দিয়াশলাই নেই এদের অবস্থা কি হবে। অনেকে করোনার জন্য ধান বিক্রি করতে পারেনি। বন্যার পানিতে তাদে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বন্যার্তদের মাঝে ঢালাওভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
জামালগঞ্জে বন্যায় ভাসছে মানুষের ভাগ্য। এই পরিস্থিতিতে বেশী বিপদে পড়েছেন নি¤œাঞ্চল ভুক্ত খেটে খাওয়া মানুষ। উপজেলা সদর থেকে এটু দূরে বাস করা বন্যা কবলিত মানুষেরা চরম দুর্যোগকাল অতিক্রম করছে। তারা ঘর থেকে বেরুতে পারছে না। নানা সংকটের মুােমুখি এসব মানুষের মাঝে জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ তৎপরতা চালানো প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন এলাকার সচেতন মানুষেরা।
এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশ^জিত দেব বলেন, বন্যার্তদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে ২৫টি আশ্রয় ক্ন্দ্রে খোলা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে দুর্গতদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। এদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা ছাড়াও পানিবন্দি অন্যদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও আশ্রয় কেন্দ্র ও ত্রাণ তৎরতা বাড়ানো হবে।