জামালগঞ্জে সুরমা নদীতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, প্রতিবাদে শ্রমিক, ব্যবসায়ী জনতার মানববন্ধন

বিশেষ প্রতিনিধি
জামালগঞ্জ উপজেলার সুরমা ও বৌলাই নদীর মোহনা গজারিয়া এলাকার সুরমা নদীর এপার ওপার থেকে (গজারিয়া ঘাট) প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদা আদায় হচ্ছে। বিআইডব্লিটিএ’র নামের টুকেন দিয়ে এখানে চাঁদা আদায় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। বেপরোয়া চাঁদাবাজীর প্রতিবাদে রোববার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বালু-পাথর, কয়লা শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জের তিন শুল্কস্টেশন, সীমান্ত নদী তাহিরপুরের যাদুকাটা, সুনামগঞ্জের চলতি-ধোপাজান এবং ছাতক থেকে বালু-পাথর, কয়লা বাল্কহেডে করে
ভৈরব, গাবতলী, দাউদকান্দিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাবার সময় সুরমা ও বৌলাই নদীর মোহনা গজারিয়া এলাকার এপার-ওপারে বাল্কহেড ভিড়িয়ে বালু-পাথর লোড-আনলোড করার সময় প্রতি ঘনফুট এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা এবং প্রতি ঘনফুট পাথর থেকে ৫ থেকে ৭ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তাতে বাল্কহেড প্রতি এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা করছে চাঁদাবাজরা। এই ঘাটে নদীতে চলতি বাল্কহেডকে ছোট ছোট ট্রলার দিয়ে ধাওয়া দিয়ে জোর করে বাল্কহেড প্রতি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা আদায় করছে বিআইডব্লিটিএ’র ইজারাদার ইয়াকবীর হোসেনের নিয়োগকৃত সাঈদুর, ইকবাল ও রুবেলসহ কয়েকজন।
গজারিয়া বাজারের ব্যবসায়ী বাদল মিয়া জানান, বেপরোয়া চাঁদাবাজী শুরু হয়েছে নদীতে। নদীতে চলতি নৌকা থেকেও টোল’এর নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। বালু লোড-আনলোড করতে চাইলে প্রতি ঘনফুট এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা এবং পাথর দুই টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে আদায় করা হচ্ছে। এই কারণে এখন আর গজারিয়া ঘাটে কেউ বাল্কহেড ভিড়াতে চায় না। গজারিয়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা কমে গেছে। বাধ্য হয়ে এসব অপকর্মের প্রতিবাদে ব্যবসায়ী, জনতা ও শ্রমিকরা মানববন্ধন করেছেন।
গজারিয়া ঘাটের শ্রমিক সর্দার জয়নাল মিয়া জানালেন, বিআইডব্লিটিএ’র নামে সুরমা নদীতে চলতি বাল্কহেড থেকেও ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ ইজারা দেওয়া হলেও চলতি বাল্কহেড বা কার্গো থেকে টোল আদায়ের নিয়ম নেই।
জানতে চাইলে বিআইডব্লিটি’এর ইজারাদার দাবিদার ইয়াকবীর হোসেন বলেন, ইজারাদার নিয়োগ হবার পর ওখানে যাই নি আমি। টোল সংগ্রাহকও নিয়োগ দেই নি। সামান্য সামান্য বালু-পাথর লোড-আনলোড শুরু হয়েছে। বালু-পাথর ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা একসঙ্গে টোল দিয়ে দেবেন।
সুরমা নদীর গজারিয়া ঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত লালপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সাবইন্সপেক্টর রুহুল আমিন দাবি করলেন, ওখানে কোন চাঁদাবাজি হয় না। কেউ লোড-আনলোড থেকেও টাকা আদায় এখনো করছে না। তবে বিআইডব্লিউটি’এর সহকারী ইন্সপেক্টর আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জামালগঞ্জের ইয়াকবীর হোসেন নামের একজন আমাকে দেখিয়েছেন। গত পহেলা জুলাই ইস্যু করা ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গজারিয়া লঞ্চঘাট ব্যতিত সুরমা নদীর এপার-ওপারে ইয়কবীর হোসেন বালু-পাথর লোড আনলোড করার সময় টোল আদায় করতে পারবেন। এই টোল আদায় ৩০ জুন ২০২০ খ্রি. পর্যন্ত করা যাবে। প্রতি ঘনফুট বালু-পাথরে কত টাকা আদায় করতে পারবেন এই কাগজ তাকে দেখানো হয় নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, এই কাগজসহ সবকিছু আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেই কেবল টোল আদায় করা যাবে। রোববার চাঁদাবাজী’র প্রতিবাদে মানববন্ধনের কথা স্বীকার করে এই নৌ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মানববন্ধন তারা কেন করেছেন জানি না, আমার এলাকায় কোন চাঁদাবাজী হয় না। চাঁদাবাজী করলে সঙ্গে সঙ্গে আটক করে চালান দেওয়া হবে।
নৌ পুলিশের সাবইন্সপেক্টর রুহুল আমিন এ প্রতিবেদককে এভাবে বললেও, বিআইডব্লিটিএ’র সহকারী ইন্সপেক্টর আসাদুজ্জামান বলেন, বিআইডব্লিটিএ’র আশুগঞ্জ-ভৈরব বাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন সুরমা ও বৌলাই নদীর মোহনা গজারিয়া ঘাটের সুরমা নদীর এপারে-ওপারে বালু-পাথর লোড-আনলোড করার সময় প্রতি ঘনফুট বালু-পাথর থেকে ২৫ পয়সা টোল আদায়ের নির্দেশনা দিয়ে এই ঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত পরিমাণের বেশি টোল ইজারাদার নিচ্ছেন বলে দুইবার ওখানকার নৌ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে সাবইন্সপেক্টর আমাদের জানিয়েছেন। আমরা এভাবে আদায় করলে আইনগত ব্যবস্থা নেবার কথা বলে দিয়েছি। ১৫ দিন আগে নৌ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ফোন দেওয়া হয়েছিল, একই কথা বলে দিয়েছি আমরা।
এদিকে, বেপরোয়া এই চাঁদাবাজীর প্রতিবাদে রোববার দুপুরে জামালগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদীর পূর্ব পাড়ে গজারিয়া বাজারে ঘণ্টাব্যাপি মানববন্ধন কর্মসুচি পালিত হয়। মানববন্ধনে বালু-পাথর, কয়লা, নৌ-শ্রমিকদের পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আসাদ আলী, প্রাক্তন ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান, ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলী আহমদ, ৪ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন, সাবেক ইউপি সদস্য সাহাব উদ্দিন, গজারিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মাওলানা এমদাদুল হক, শ্রমিক নেতা কামরুল ইসলাম, নৌযানের শ্রমিক বশির আহমদসহ স্থানীয় লোকজন।