জামায়াত পৃষ্ঠপোষকতা কৌশলের খেলা নয়

নিবন্ধন বাজেয়াপ্ত যুদ্ধাপরাধী বলে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিএনপি কৌশলে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দেয়ার বিষয়ে দলটির দায়িত্বশীলরা বলেছেন, তারা কোন যুদ্ধাপরাধীকে মনোনয়ন দিচ্ছেন না। এ কথা ঠিক, জামায়াতের যে প্রার্থীরা এখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচন করছেন, আইনি দৃষ্টিতে তারা কোন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নয়। কিন্তু এদের অনেকের পিতাই যুদ্ধাপরাধী হিসাবে দ-প্রাপ্ত। এর মধ্যে দেলেয়ার হোসেইন সাইদী ও মতিউর রহমান নিজামী অন্যতম, যাদের পুত্ররা এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই-সন্তানও এইভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। রাজনীতিতে কৌশলের খেলা রয়েছে, রয়েছে কথার মারপ্যাঁচ- এসব সত্য। কিন্তু এই কৌশলের সাথে কি আদর্শের কোন যোগসূত্র নেই? কৌশল নির্ধারিত হয়ে থাকে আদর্শিক অবস্থান থেকেই। বিএনপি বরাবরই জামায়াতের মিত্র বলে বিবেচিত। এই দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করার যে ব্যবস্থা ১৯৭৫ সনের পর বিএনপি করে গিয়েছিল সেই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের পুনরুত্থান ঘটে। জামায়াতকে সরকারের অংশীদার করে মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকা দানের কৃতিত্বও বিএনপিরই। এরকম অবস্থায় জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিএনপি নির্বাচনী কৌশল ঠিক করবে এমনটি ভাবা একেবারেই অবান্তর। কিন্তু বিএনপি এখানে কথার মারপ্যাঁচে যে কৌশলী কথাটি বলার চেষ্টা করছে সেটি হলো, যুদ্ধাপরাধীর সন্তান যুদ্ধাপরাধী নয়। তাই তারা সাইদী-নিজামী-সাকা পুত্রদের মনোনয়ন দিয়ে কোন ভুল করেনি। অর্থাৎ এইসব যুদ্ধাপরাধী সন্তানরা তাদের পিতার অপরাধকর্মের কোন দায় বহন করেন না। কথাটি কি নির্জলা সত্য?
যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী যেসব কর্মকা-ে একাত্তরে জামায়াত অংশ নিয়েছিল সেটি তারা আদর্শ তাড়িত হয়েই করেছিল। একাত্তরে জামায়াত বিজয়ী হলে এই দেশে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা সক্রিয় ছিল তাদের চিহ্ন পর্যন্ত থাকত না। যেসব মতাদর্শে একাত্তরে বীর বাঙালি যুদ্ধ পরিচালনা করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল জামায়াত ছিল তার বিপরীত আদর্শিক অবস্থানে। সুতরাং তারা ওই সময় যে বর্বর কর্মকা- পরিচালনা করেছিল সেটি নিজেদের আদর্শকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যেই করেছিল । একাত্তরের মানবতা বিরোধী কর্মক- তথা যুদ্ধাপরাধ নিছকই জামায়াতের নীতি-আদর্শের একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। জামায়াত কখনও তাদের একাত্তর পূর্ব নীতি-আদর্শ ত্যাগ করেনি। ভুলেও একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য তারা বিন্দুমাত্র লজ্জা অনুভব করে না। একাত্তর পূর্ব ও পরবর্তী জামায়াত একই আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে চলেছে। ঠিক এই কারণেই যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী কর্মকা-ের দায় জামায়াতের সক্রিয় সকল নেতা-কর্মী এখনও বহন করে থাকেন। সাইদী বা নিজামীর সন্তানরা কখনও তাদের পিতার একাত্তরের কর্মকা-কে নিন্দা করেননি। এই সন্তানরা সেই জামায়াতই করছেন যে জামায়াত একাত্তরের কর্মকা-ের জন্য জাতির কাছে এখনও ক্ষমা চায়নি বা অনুতপ্ত হয়নি। সুতরাং তারা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ সংঘটন না করলেও এর আদর্শিক দায় অবশ্যই বহন করেন। কোন কৌশলী প্রচারণা চালালেও তা হবে শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার শামিল।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র তার মৌলিক চরিত্রের সাথে কখনও আপোষ করতে পারে না। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোই হল একাত্তর। তাই একাত্তরকে অস্বীকার করার অর্থ হল স্বাধীন এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। জামায়াত যতদিন একাত্তর প্রশ্নে নিজেদের আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তন না ঘটায় ততদিন পর্যন্ত দলটির নেতৃত্বকে এবং সমানভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে হবে।