জাহানারা বেগমের সাফল্যের গল্প

স্টাফ রিপোর্টার
ছোটবেলায় প্রবল ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া করার। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে আর লেখাপড়া এগিয়ে নিতে পারেননি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি দুই জায়গাতেই অভাবের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়া করানোর জেদ ছিল মনে। এজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, গড়ে তুলেছেন নার্সারি। করেছেন মাছ চাষও। বর্তমানে তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন, পেয়েছেন জয়িতার সম্মাননাও।
বলছিলাম বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চালবন্দ গ্রামের জাহানারা বেগমের কথা। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে জাহানারাকে অর্থনৈতিকভাবে সফল নারীর পুরস্কার দেয়া হয়। তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। সমাজের জন্যও কাজ করছেন জাহানারা। গ্রামের ৩০ জন নারী মিলে ‘এসো কাজ করি’ নামের একটি সংগঠন করেছেন। সংগঠনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে, যৌতুক, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ এবং মেয়েদের লেখাপড়ায় উৎসাহ জোগানো হয়।
স্বামী ও দুই ছেলে নিয়ে সংসার জাহানারা বেগমের। তিন একর জমির ওপর জাহানারার বাড়ি। বসত ঘরের সামনে এক চিলতে উঠোন। এর বাইরে পুরোটাই গাছগাছালিতে ভরা। আম, জাম, কাঁঠাল, কমলা, লিচু, পেঁপে, পেয়ারা, নারকেল, সুপারি, আতাফল, কামরাঙা, জলপাই, জাম্বুরা প্রভৃতি। বেশির ভাগই ফলের গাছ। বগুড়া থেকে এনেছেন বিভিন্ন জাতের আমের চারা। এর মধ্যে রয়েছে হারিভাঙা, হিমসাগর, আ¤্রপালি। এছাড়াও রয়েছে ফুল, ঔষুধীসহ নানা প্রজাতির গাছ।
সম্প্রতি ৯০ শতক জমি পাঁচ মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘পুষ্প কানন’ নামে বিনোদন কেন্দ্র। এটি সুনামগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে লালপুর এলাকায় সড়কের পাশে। সেখানে তিনি ফুলের বাগান করছেন। তিনি বলেন, ছোট্ট ছেলে মেয়েরা বই পুস্তকে বিভিন্ন ফুলের নাম শিখে। কিন্তু বাস্তবে দেখেনি। আমার পুষ্প কাননে এসে বিনোদনের পাশাপাশি বিভিন্ন ফুলের নাম বাস্তবে দেখে শিখতে পারবে।
জাহানারা বেগম বলেন, মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে ১০ জনের সংসার ছিল আমাদের। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। একবেলা দু’মুঠো খেলে অন্য দু’বেলা উপোস থাকতে হতো। ছোটবেলার সেই কষ্ট এখনো মনে গেঁথে আছে। অনাদর-অবহেলা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়। স্বামীর জমি-জিরাত ছিল না। কৃষিকাজ করে টেনেটুনে সংসার চলতো। এরমধ্যে আমার দুই সন্তান হয়।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বড় ছেলে বেলাল হোসেন পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। তাকে পড়াশোনা করাতে খরচ লাগবে। টাকা পাবো কোথায়? এরমধ্যে একদিন শুনি গ্রামের নারীরা মিলে একটি সমিতি করেছেন। আমিও সদস্য হই। কিছুদিন পর উপজেলায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। ঋণ নেই চার হাজার টাকা। এরপর চার শতক জমিতে মরিচ ও পেঁপে গাছের চারা করি। চারা কিছুটা বড় হলে একটি ঝুড়িতে ৫০টি চারা দিয়ে বাজারে পাঠাই স্বামী হাসান আলীকে। তিনি বাড়ি ফিরে জানান, সব চারা মানুষ হাতে হাতেই কিনে নিয়েছে। চারা বিক্রি করেই ছয় মাস পর ঋণ শোধ করি। এরপর প্রতি বছর নার্সারি বড় হয়। এখন মানুষ বাড়ি থেকে এসে চারা নিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে নার্সারির পরিচর্চা করি। এছাড়া সহায়তার জন্য আরও তিনজন লোক রয়েছে।
জাহানারা বেগম আরও বলেন, নার্সারিতে এখন ৬০ হাজারের মতো চারা আছে। বছরে তিন লাখের মতো চারা উৎপাদন হয় আমার নার্সারিতে। পাইকারি এবং খুচরা দুই ভাবেই চারা বিক্রি করি। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও চারার অর্ডার দেয়। আবার কেউ কেউ এক লাখ, দেড় লাখ টাকার চারাও কিনে নেয়। নার্সারিতে ১৫ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকা দামের চারা আছে। বর্তমানে নার্সারিতে ১৫ লাখ টাকার চারা আছে। তিনি বলেন, এক সময় ছোট্ট ছনের ঘর ছিল, এখন টিনের ঘর বানিয়েছেন। ঘরে বিদ্যুৎ এনেছেন।
তিনি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে মাছ চাষ শুরু করি। বাড়িতে দুটি পুকুর আছে। মাছ চাষে বছরে আয় হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তবে গত বন্যায় মাছ চাষে লোকসান হয়েছে। বন্যায় সব মাছ ভেসে গেছে। সে সময় প্রায় ৯ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির চারারও ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। পরে ঋণ করে চারা কিনে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, আমরা কৃষকদের বীজ ও সার সহ পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছি। নারী উদ্যোক্তা জাহানারা বেগম কে বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করেছি।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, গত বন্যায় সুনামগঞ্জের মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী তাদের ঋণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। কেউ সহযোগিতা বা ঋণ না পেলে, আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা তাকে সহায়তা করতে চেষ্টা করব।