জীবিতকে মৃত বানিয়ে ফেলা/ এই ভুলের দায় কার?

রবি ঠাকুরের কাদম্বীনিকে মরিয়া প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, সে আগে মরে নাই। জীবন ও মৃত্যুর রহস্য বুঝাতে রবি ঠাকুর ওই নাটকে কাদম্বিনী চরিত্রকে নানা রহস্যময়তার মধ্য দিয়ে পরিণতি দান করেছেন। কিন্তু একালে জীবিতকে মৃত দেখানো কিংবা মৃতকে জীবিত বানানো হরহামেশাই ঘটতে দেখি আমরা। যারা এরূপ জীবিত-মৃত সনদ বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা নিতান্তই তাচ্ছিল্যভরে বিধাতার বিধানকে অস্বীকার করে মহাক্ষমতাধরের মতো এমন কাজ করে ফেলেন। এতে বিড়ম্বনা বাড়ে জগৎবাসী মানুষের। মানুষ সাহিত্যে রহস্য ভালোবাসে কিন্তু নিজের জীবনে কোনো রহস্যময়তা পছন্দ করে না। তাই হরেদরে জীবিত কেউ যখন নিজেকে মৃতদের তালিকায় আবিষ্কার করে তখন সে আঁতকে উঠে। জীবন তার অতি পছন্দের বিষয়। দুনিয়ার কেউই মরতে চায় না। এ হলো মানব মনের চিরন্তন আকুতি। এহেন মানুষ জীবিত থাকতেই মৃত তালিকায় নাম উঠায় এর বিস্বাদ বুঝতে পারে ভালভাবেই। সত্যিকার অর্থে কেউ মরে গেলে এর পর তিনি হয়তো কিছুই বুঝতে পারেন না। কিন্তু জীবন্মৃতদের জ্বালা যে ভয়ংকর সে ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝে না। বুঝে না বলেই কেউ একজন কর্মাধাক্ষ নিজের দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে রীতিমতো জীবিত কাউকে মৃত ঘোষণা করে দেন। এরকমই এক খবর জানা গেল গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের এক সংবাদভাষ্যে।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইলগাঁও গ্রামের বাসিন্দা গৌরাঙ্গ দেব। তিনি রানীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী। সম্প্রতি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এই কাজে মাঠ পর্যায়ের জন্য সরকারিভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন অনঙ্গমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিবুর রহমান। এই কাজের সুপারভাইজারের দায়িত্বে ছিলেন রমাপতিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ারুল হক। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারের হাত দিয়ে ভোটার তালিকার হালনাগাদকৃত যে অংশ চূড়ান্ত হয়েছে সেখানে জীবিত গৌরাঙ্গ দেবকে মৃত দেখানো হয়। ফলস্বরূপ জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজ থেকে তার এনআইডির তথ্য উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী গৌরাঙ্গ জরুরি কাজে ব্যাংকে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের নির্দিষ্ট সফটওয়ারে তার এনআইডি খোঁজে পায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ওই ব্যবসায়ী। এছাড়া সংশোধন হওয়ার আগে তিনি কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। দুই সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির দায়িত্বহীনতার কারণে আজ একজন গৌরাঙ্গ দেব তার যাবতীয় নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন। এর দায় কে নিবে?
একেবারে পরিষ্কার, এই দায়িত্বহীনতার দায় তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারকেই বহন করতে হবে। ঘরে বসে ইচ্ছামাফিক কোনো একজনকে মৃত বানিয়ে ফেলা চরমভাবে দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধ। বিশেষ করে ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি কাজে এমন অবহেলা অমার্জনীয়। দেখার বিষয় হলো, নির্বাচন অফিস এদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তবে সবার আগে গৌরাঙ্গ দেবকে ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করে তার স্থগিত হয়ে যাওয়া জাতীয় পরিচয় পত্রকে কার্যকর করতে হবে। এখন নাগরিকদের বহু কাজে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন পড়ে। এই এনআইডির অভাবে ব্যবসায়ী গৌরাঙ্গ এখন পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হবেন। আমরা জানি না এমন অবস্থা আর কয় জনের হয়েছে। আমরা কেবল একজনের খবর জানতে পেরেছি। আরও অনেকেই এমন থাকতে পারেন। তাই উপজেলা নির্বাচন অফিসকে দ্রুত আগের তালিকা থেকে যে সংযোজন বিয়োজনগুলো করা হয়েছে সেগুলো পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে।
সরকারি বিধিগত জটিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিকার পেয়ে গৌরাঙ্গ দেবের পুনরায় ভোটার ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে বেশ ঘাম ঝরাতে হতে পারে। আমরা চাইব নির্বাচন অফিস তাকে এই যন্ত্রণার মধ্যে না ফেলে স্বপ্রণোদিত হয়ে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তাহলে অন্তত আগের ভুলের কিছুটা বোঝা কমবে।