জেগে থাকো সাহসে প্রেরণায়

সুখেন্দু সেন
যুদ্ধের কাল কি শেষ হে বীর!
এখনও তো বাকি রয়ে গেছে কতো কিছু,
রক্তে আঁকা মানচিত্র কেঁপে কেঁপে ওঠে অস্থির।
শত্রুরা নিয়েছে পিছু,
যেতে হবে সম্মুখে আরও বহুদূর,
সাহসে প্রেরণায় জেগে থাকো প্রিয় মতিউর।

যৌবন ছুঁই ছুঁই উড়ন্ত সময়ে প্রথম প্রেম দেশপ্রেম।
দুরন্ত ভালোবাসা মাতৃভূমির জন্য। এই ভালোবাসা এই প্রেমেই যুদ্ধযাত্রা। বই খাতা ফেলে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফসল আমাদের মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে যে দামাল তরুণেরা মৃত্যুকে তুচ্ছ করে লড়াইয়ের ময়দান দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান তাঁদেরই একজন।
১৯৫৩ সালের ৯ জুন সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে মতিউর রহমানের জন্ম। পিতা আলহাজ¦ মদব্বীর আলী এবং মাতা মেহেরুন্নেছা খাতুন। স্কুল জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রবল জাগরণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। ১৯৭১ সালে সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নকালীন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ইকোওয়ান প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সম্মুখযুদ্ধে। দূবীর্ণটিলা মুক্তকরণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ নেন। সঙ্গী—সাথী—সহযোদ্ধারা অনেকেই শহীদ হন। তেমনি সুনামগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা তালেব আহমদ শহীদ হলে যুদ্ধ শেষে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান। সময়ের অস্থিরতায় ছাত্ররাজনীতির অনেক চড়াই উৎরাই পেরুতে হয়েছিল। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। এ সময় বৎসরকাল থাকতে হয় আত্মগোপনে।
একসময় ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দেন মধ্যপ্রাচ্যে। প্রবাসের অবরুদ্ধ পরিবেশে স্বাধীনচেতা মানুষটি খাপ খাইয়ে নিতে পারেন নি। অল্পকাল পরে দেশে ফিরে এসে ব্যবসায় মনোনিবেশ করলেও প্রচলিত অর্থে উন্নতি বলতে যা বোঝায় তা হয় নি। তবে সৎভাবে জীবন ধারণ ও সংসার প্রতিপালনের সংস্থান হয়েছিল। একনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে। যুক্ত হন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে। গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি ছিলেন সতত সোচ্চার। সুনামগঞ্জ জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের তিনি ছিলেন বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক। মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টানা ২২ বছর, সুনামগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন ২০ বছর। মঙ্গলকাটা হাইস্কুল, কৃষ্ণনগর হাইস্কুল, সুনামগঞ্জ রাজগোবিন্দ প্রাইমারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি।
সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় ১২৫ বছর উদযাপন পরিষদের তিনি ছিলেন সদস্য সচিব। এছাড়াও ছিলেন সনাকের সক্রিয় সদস্য, শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘর ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের উপদেষ্টা। সুরমা নদীর ভাঙ্গনে মধ্যশহর হুমকির মুখে পতিত হলে কর্তৃপক্ষের নিস্পৃহতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। ই—স্কুল নামের একটি সংগঠন থেকে গরিব দুঃস্থ শিক্ষার্থীদের সাহায্য সহযোগিতা এবং নিজস্ব অর্থে অনেক দরিদ্র ছাত্র ও পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করে যেতেন নীরবে। বই পাঠে উৎসাহ দেয়ার জন্য সুনামগঞ্জ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সেরা পাঠককে তিনি নিজ অর্থে পুরস্কৃত করেছেন। সারাজীবন রাজনীতি আন্দোলন সংগ্রাম বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও আঙ্গুল ফুলে কদলি বৃক্ষ হওয়ার মোহ তাঁকে কখনও পায়নি।
সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। স্পষ্ট ভাষায় এবং বলিষ্ঠভাবে কোনোরকম রাখ ঢাক না করেই তিনি প্রতিবাদে অভ্যস্ত ছিলেন। একথাও সত্য এই স্পষ্টবাদিতার কারণে তিনি অনেক সময় অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন।
প্রৌঢ়ত্ব অতিক্রম করার পর তিনি কিছুটা অবসাদগ্রস্ততা এবং রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হন। একেবারে সক্রিয় না হলেও রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তাঁকে ছেড়ে যায় নি বা তিনিও ছেড়ে থাকতে পারেন নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব তুলে ধরার জন্য নিয়েছিলেন বিভিন্ন উদ্যোগ। এর থেকেই লেখালেখিতে মনোনিবেশ। যুদ্ধকালীন অনেক অজানা অধ্যায় তিনি তাঁর লেখায় সহজ ও সরল ভাষায় তুলে এনেছেন। অতীত স্মৃতিরোমন্থনে বেশকিছু বাস্তব জীবন চিত্র যেমন— ত্যাগী রাজনীতিক, অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধা আবার অনেক ব্রাত্যজনের কথাও তিনি পরম মমতায় গ্রন্থাগারে প্রকাশ করেছেন। বর্ণিল জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণ থেকে টুকরো টুকরো ঘটনা নিয়ে তার ‘গল্প নয় সত্য’ গ্রন্থটি বেশ সুখপাঠ্য। ‘রক্তমাখা কথামালা’ নামক বইটিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সাথে প্রায় ১ শত জন মুক্তিযোদ্ধার ছবি সন্নিবেশিত করেন, কয়েক বছর আগে যা নিতান্তই একটি কঠিন কাজ ছিল। বিলাত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লেখেন ‘বিলাতে যা দেখেছি যা শুনেছি’ নামের একটি বই, যাতে সেখানকার জীবনযাত্রার একটি সুন্দর বর্ণনা বিধৃত হয়েছে। এছাড়াও ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামে গ্রন্থের সম্পাদনাসহ বেশ কয়েকটি পুস্তিকা তিনি প্রকাশ করেছেন, যা সময়ের দলিল হিসাবে একদা বিবেচিত হতে পারে। সুনামগঞ্জের সকল স্থানীয় পত্র—পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লেখতেন। যাতে গণমানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটতো।
ব্যক্তিগত জীবনে মতিউর রহমান ২৫ বছর বয়সে ১৯৭৮ সালে বিয়ে করেন রওশন আরা বেগমকে। যিনি একজন স্নেহশীলা ও বিচক্ষণ গৃহিণী এবং অতিসাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত মহিলা। তাঁদের ৩ পুত্র, ১ কন্যা, সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ভদ্র ও বিনয়ী হিসেবে পরিচিত।
মতিউর রহমান তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ৭ নভেম্বর ২০২১ খ্রি. তারিখে ইহকালের বন্ধন ছিন্ন করে পাড়ি দিলেন পরপারে। পড়ে রইল তার প্রিয় শহর, রাজপথ, শহীদ মিনার, জুবিলীর মাঠ, সুরমার তীর, কলেজের করিডোর, কত কত আড্ডাস্থল, আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, ব্যথিত স্বজন গুণগ্রাহী প্রিয় মানুষেরা। আমরা হারালাম এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে, এক প্রবাদ প্রতীম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে, একজন ভালবাসার মানুষ, ভরসার স্থল। তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের অন্তরে। তাঁর স্মৃতি হোক প্রেরণার উৎস। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ায় তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে বলেই আমাদের বিশ^াস।