জেলাজুড়ে বাণিজ্য!

বিন্দু তালুকদার
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে জেলাজুড়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
শাল্লা ও ছাতক উপজেলার দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে জেলা প্রশাসকের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ হয়েছে। তবে অনেক বিদ্যালয়ের বঞ্চিতরা দুর্নীতির প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।
জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সদস্য সচিব উপজেলা শিক্ষা অফিসার, সদস্য হিসেবে আছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে না জানিয়েও নিয়োগ প্রদান করা হচ্ছে।
তেমনি একটি ঘটনার শিকার ছাতক পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের কুমনা গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা অধীর চন্দ্র পাল। তিনি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী পদে ছেলের একটা চাকুরি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে আশা করেছিলেন। তার ছেলে গোপাল চন্দ্র পাল গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ পেতে আবেদন করেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা নেয়া হয়। গোপাল পালের পরীক্ষাও ভাল হয়। কিন্তু নিয়োগ কমিটির দুই সদস্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সভপতিকে না জানিয়েই সকল নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে গত ১১ মার্চ বিদ্যালয় ক্যাচম্যান্ট এলাকার বাইরের অন্য গ্রামের বাসিন্দা ৫ নং ওয়ার্ডের লেবারপাড়ার শফিকুল ইসলামের ছেলে রুবেল আহমদকে নিয়োগ প্রদান করেন।
এঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা অধীর চন্দ্র পাল রুবেল আহমেদের নিয়োগ বাতিল করে তার ছেলেকে নিয়োগ প্রদানের দাবি জানিয়ে গতকাল বুধবার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
জেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন,‘ অভিযোগের বিষয়গুলো খোঁজ-খবর নেয়া হবে।’
কুমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন বলেন,‘ আমরা জানতাম গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার ছেলেরই চাকুরি হবে। কিন্তু কিভাবে যে কি হয়ে গেল বুঝলাম না। অনিয়ম করে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অন্য ওয়ার্ডের অন্য গ্রামের একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’
কুমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশিকুর রহমান বলেন,‘পরীক্ষা ফল প্রকাশ ও চূড়ান্ত নিয়োগের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। নিয়োগ তালিকায় যার নাম দেখেছি, সে বিদ্যালয়ের ক্যাচম্যান্ট এলাকার নয়। আমি তাকে ক্যাচম্যান্ট এলাকার বাসিন্দা বলে কোন প্রত্যয়নপত্র দেইনি। ’
ছাতক উপজেলা দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ কমিটির সংসদ সদস্য মনোনীত প্রতিনিধি সৈয়দ আহমদ বলেন,‘ শুধুমাত্র নিয়োগ পরীক্ষার সময় আমাকে ডাকা হয়। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা তৈরি বা নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে আমার কোন মতামত নেয়া হয়নি।’
দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছাতক উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবেদা আফসারি বুধবার বিকালে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘ আমি ঢাকা থেকে ছাতকে ফিরছি, কাগজপত্র না দেখে সঠিকভাবে কিছু বলা যাবে না। কাগজপত্র দেখে জানাতে পারব কি হয়েছে।’
এদিকে ছাতকের কুমনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতই শাল্লার সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য চারজন প্রার্থী আবেদন করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলে তাদেরকে জানানো হয়। নির্দিষ্ট তারিখে সবাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে গেলেও তাদের পরীক্ষা নেয়া হয়নি। পরবর্তীতে পরীক্ষার তারিখ জানানো হবে বলে সেদিন তাদের জানানো হয়।
কিন্তু তিনজন প্রার্থীকে কোন ধরনের নোটিশ না দিয়ে বা অবগত না করেই ৪ মার্চ সুলতানপুর গ্রামের মধু মিয়ার ছেলে মামুন মিয়াকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। তিনজন পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, তাদেরকে না জানিয়ে শুধুমাত্র মামুন মিয়াকে নিয়োগ প্রদানের জন্য তার একার পরীক্ষা নেয়া হয় এবং অনিয়মের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে একজনকে নিয়েই পরীক্ষা নেয়া ও নিয়োগ দেয়া হয়।
পরীক্ষা না নিয়ে শুধুমাত্র একজনকে ডেকে নিয়ে নিয়োগ প্রদান করার প্রতিবাদে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ৫ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন তিন পরীক্ষার্থী আনিছ মিয়া, শফিকুল ইসলাম ও জাকির হোসেন। তাদের অভিযোগ অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী পদের পরীক্ষার্থী আনিছ মিয়া বলেন,‘ প্রথমবার আমাদের নোটিশ দিয়ে জানানো হলেও দ্বিতীয়বার জানানো হয়নি। একজনকে নিয়ে পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ না থাকলেও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে একজনের পরীক্ষা নেয়া হয় এবং তাকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ’
সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বনশ্রী মজুমদার বলেন,‘২৮ ফেব্রুয়ারি সবাইকে ডাকা হয়েছিল, কিন্তু পরীক্ষা নেয়া হয়নি। পরে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের (টিইও) মৌখিক নির্দেশে ৪ মার্চ সকল পরীক্ষার্থীর উপস্থিত হওয়ার জন্য আমি তাদেরকে মৌখিকভাবে অনুরোধ করি। কিন্তু একজন উপস্থিত হয়েছিলেন। একজন দিয়ে পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি আমি টিইও স্যারকে অবগত করলে একজনেরই পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে টিইও স্যারের নির্দেশেই ১১ মার্চ আমি নিয়োগপত্র প্রদান করি।’
এ ব্যাপারে নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব শাল্লা উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও) মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন,‘ অভিযোগকারীদের দাবি ডাহা মিথ্যা। তাদেরকে নোটিশ করা হয়েছিল। তারা আসেনি, তাই যে উপস্থিত ছিলো তার পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এই নিয়োগের বিষয়ে সবকিছু অবগত আছেন।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্য অনুযায়ী নোটিশ না দিয়ে মৌখিকভাবে অনুরোধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন,‘ নোটিশ দেয়া হয়েছে, এসবের প্রমাণ আছে।’
নিয়োগ ও বাছাই কমিটির সভাপতি শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল মুক্তাদির হোসেন বলেন,‘তিন জনের অভিযোগ সঠিক নয়। সবাইকে জানানো হয়েছিল, কিন্তু তারা আসেনি। একজনকে নিয়ে পরীক্ষা নেয়া যাবে না এমন কোন বিধান নেই, তাই যে উপস্থিত ছিল তার পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এবং নিয়ম মেনে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ’