জেলার জলমহালগুলো থেকে শনির দৃষ্টি দূর হোক

জেলার মিঠাপানির মাছের অন্যতম আধার এবং একইসাথে অর্থনৈতিক ও উৎপাদন কার্য়ক্রমের একটি প্রধান উৎস জলমহালগুলোর ইজারা নিয়ে নয়-ছয় থামছেই না। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলার বারিয়া নদী জলমহাল ইজারা নিতে একটি সমিতি প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এই প্রতারণাকা-ে সহায়তা করেছে প্রশাসনেরই কিছু লোক। সংবাদসূত্র অনুসারে ওই জলমহালটি ১৪২৯ বাংলা সনের পরবর্তী ৩ বছরের জন্য ইজারা নিতে আবেদন করে বালিজুরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ও বারিয়া নদী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি নামের ২টি সমিতি। কোন্ সমিতি জলমহালের নিকটবর্তী তা নির্ধারণের জন্য উপজেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি বালিজুড়ি সমিতিকে নিকটবর্তী দেখিয়ে প্রতিকেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনের আলোকে বালিজুড়ি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে জলমহালটি ইজারা দেয়া হয়। এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী বারিয়া নদী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি এ মর্মে অভিযোগ দাখিল করে যে, বালিজুড়ি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জলমহালের নিকটবর্তী দেখাতে সমিতি কর্তৃপক্ষ জনৈক নিখিলচন্দ্র দাসের স্বাক্ষর জাল করে তার জায়গায় সমিতির কার্যালয় রয়েছে মর্মে একটি ভুয়া চুক্তিপত্র দাখিল করে। এই চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে বালিজুরি সমিতিকে জলমহালের নিকটবর্তী দেখাতে উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। বারিয়া নদী সমিতির পক্ষ থেকে নিখিলের সাথে সম্পাদিত বালিজুরী সমিতির চুক্তিপত্রকে ভুয়া এবং সার্ভেয়ারের তদন্ত প্রতিবদনকেও পক্ষপাতমূলক দাবি করা হয়েছে। এদিকে নিখিল চন্দ্র দাসও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে সাক্ষাৎ করে তার স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি অবহিত করেছেন। সংবাদমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার বলেছেন, তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মৌখিক নির্দেশক্রমে এমন প্রত্যয়নপত্র দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি পুনঃতদন্ত হয় তবে তিনি সঠিক তথ্য প্রকাশ করবেন’।
এই যে বারিয়া নদী জলমহাল ইজারা নিয়ে একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এরকম অবস্থা আরও বহু জলমহালের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। তথাকথিত যেসব মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম সামনে আসে সেগুলো কোনো প্রকৃত মৎস্যজীবীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না বলে শোনা যায়। এসব সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণ থাকে কিছু প্রভাবশালী সাবেক জলসর্দার নামে আখ্যায়িত ইজারাদারদের হাতেই। এরাই নানা ছলচাতুরির আশ্রয় গ্রহণ করে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করে জলমহাল ভোগদখল করে আসছে। এতে সরকারের ‘জাল যার জলা তার’ নীতিমালা প্রকাশ্যেই যুগের পর যুগ ধরে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। আর এরকম ভুয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমনসব পাকচক্রে পড়ে জেলার বেশ কিছু জলমহাল বছরের পর বছর যাবৎ ্ইজারা কার্যক্রমের বাইরে থাকছে বলেও শোনা যায়। বৈধভাবে ইজারা দেওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে অভিনব সব পন্থা ব্যবহৃত হয়। অথচ এসব বাধা দূর করে সরকারি রাজস্ব বাড়ানো ও জলমহালে সুব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগের যথেষ্ট ঘাটতিও লক্ষ্য করা যায়। বলাবাহুল্য এরকম অব্যবস্থাপনার কারণে জলমহালগুলোতে পারষ্পরিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয় যা মাঝে মধ্যেই সহিংস রূপ ধারণ করে। জেলার জলমহালগুলো থেকে এই শনির দৃষ্টি দূর হওয়াটা সকলে কামনা করেন।
ধর্মপাশার বারিয়া নদী জলমহালে যে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার সঠিক তদন্ত হোক। আইনানুগ পন্থায় যে সমবায় সমিতি ইজারা পাওয়ার যোগ্য সে সমিতিই ইজারা পাক এই আমাদের কামনা। এর চাইতেও বড় কাম্য হলো, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলো প্রকৃত মৎস্যজীবীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হোক। মৎস্যজীবীদের নাম ব্যবহার করে তাদের সাথে এই ধরনের প্রতারণা চিরদিন চলতে দেয়া উচিৎ নয়।