জেলার ২২৯ টি কমিউনিটি ক্লিনিকে অচলাবস্থা সৃষ্টি

বিন্দু তালুকদার
চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) টানা আন্দোলনে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যহত হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলার ২২৯ টি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি দায়িত্ব ফেলে আন্দোলনে থাকায় বিপাকে পড়েছে সেবাগ্রহিতা গ্রামের দরিদ্র লোকজন। অনেক এলাকার লোকজন চিকিৎসাসেবা ও ঔষধ নিতে এসে ক্লিনিক তালাবদ্ধ দেখে ফিরে যাচ্ছেন।
তবে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস বলেন,‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ রয়েছে, তা সঠিক নয়। আমরা এফডব্লিওএ (পরিবার কল্যাণ সহকারি) ও এইচএ গণকে (স্বাস্থ্য সহকারিদের) দিয়ে ক্লিনিকগুলো চালু রেখে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদান করছি। তবে আমাদেরও চরম জনবল সংকট রয়েছে। ’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গর্ভবতী মায়ের সেবা, শিশু স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক প্রসব, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, গর্ভবর্তী নারী ও শিশুদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন হেলথ সেবা, দৈনিক ও মাসিক রিপোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করাসহ আরো অনেক স্বাস্থ্য সেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে রেখেছেন সিএইচসিপিরা।
তবে কোথাও কোথায় পরিবার কল্যাণ সহকারি ও স্বাস্থ্য সহকারীদের দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো      চালু রেখে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে তার কোন তথ্য সিভিল সার্জন দিতে পারেননি।
শনিবার জেলার বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোন কোন ক্লিনিক তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। আবার কোন কোন ক্লিনিক খোলা রয়েছে, সেখানে পরিবার কল্যাণ সহকারি ও স্বাস্থ্য সহকারীরা সেবা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে অনেগুলোতে সেবা নিতে আসা অসহায় রোগীরা সেবা ও ঔষধ না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা আলী আব্বাসের স্ত্রী কলসুমা ও তার দেড় বছর বয়সী মেয়ে শিশু বাচ্চাকে নিয়ে সেবা নিতে এসেছিলেন ফেকুল মাহমুদপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে এবং তাদের সাথে ছিলেন আরও দুইজন বৃদ্ধা। কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শনিবার সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া, মাইজবাড়ি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ঝড়ঝড়িয়া, ভাতেরটেক, দিরাই উপজেলার কল্যাণী, কুগি, খাগাউড়া,  জামালগঞ্জের ফেকুল মাহমুদপুর, খুজারগাঁও, আমানীপুর, লক্ষীপুর, লম্বাবাঁক, ভরতপুরসহ আরও বিভিন্ন এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা ছিল ।  
জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সারাদেশের মত সুনামগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলার কর্মরত কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা স্ব স্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। পরে ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করেন তারা। ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মবিরতি ও ২৭ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। সরকার তাদের দাবি না মানায় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন সিএইচসিপিরা।
চলমান আন্দোলনের কারণে সুনামগঞ্জ জেলার ১১ উপজেলার ২০৬ টি কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম অচলাবস্থায় পড়েছে।
প্রসঙ্গত, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কার্যক্রম হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে। ১৯৯৬ সালে এ কার্যক্রম গৃহীত হয় এবং বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে এক হাজারের বেশী কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় আট হাজার ক্লিনিক চালু করা হয়। কিন্তু ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ৬ বছর মেয়াদে এসব ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু করে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবার কথা মাথায় রেখে ২০১৩ সালে চাকরি রাজস্ব খাতে অর্ন্তভূক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু এখন সে উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। ২০১১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকে দেশের ১৪ হাজার সিএইচসিপি নিয়োগ পায়। এরমধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন সিএইচসিপি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং ৫২ শতাংশ নারী। সিএইচসিপিরা শুরু থেকে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। পরবর্তীতে দাবি পূরণ না হওয়ায় সিএইচসিপিরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
সিএইচসিপিদের দাবি, হাইকোর্ট তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রায় প্রদান করেন। তবে সরকার এখনও তাদের দাবি বাস্তবায়ন করেনি। এখন ‘এক দফা, এক দাবি’ চাকরি জাতীয়করণের লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ অনশন পালন করছেন তারা।
সুনামগঞ্জ জেলা সিএইচসিপি এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নিজাম নূর বলেন,‘গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছিল। ২০১৩ সালে আমাদের চাকরি রাজস্ব খাতে অর্ন্তভূক্তকরণের আশ্বাস দিয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সে উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) আমাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রায় প্রদান করলেও এখনও সরকার দাবি বাস্তবায়ন করেনি। তাই আমরা চাকরি জাতীয়করণের লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ অনশন পালন করছি।’