জেলায় কেনা হবে আরও ১০৮৪৫ টন ধান

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ থেকে আরও ১০৮৪৫ টন বোরো ধান সংগ্রহ করার জন্য খাদ্য বিভাগকে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে উপজেলাওয়ারি ধান কেনার বরাদ্দও নির্ধারণ করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ থেকে এই বছর ধান কেনা হবে ১৭৩৫৩ টন। ২৫ এপ্রিল থেকেই সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান কেনা শুরু হবার কথা ছিল। কেনা হবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। সুনামগঞ্জে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ধান কেনা হয়েছে ১০৬৫ টন। যা উল্লেখ করার মতোই নয়।
সুনামগঞ্জ খাদ্য গুদাম সংশিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন,‘আমরা ইমেজ সংকটে ভুগছি। কৃষকরা আমাদের বিশ্বাস করছে না। কৃষকরা মনে করছে গুদামে আসলে হয়রানির শিকার হতে হয়। অতএব, তারা এখানে আসছে না। এরপর সিদ্ধান্ত আছে একজন কৃষক ৪০০ কেজি ধান দিতে পারবে, ৪০০ কেজি ধান গুদামে নিয়ে আসলে পথের খরচায় আর লাভে পুষাবে না কৃষকের। এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে চিন্তায় আনতে হবে। কমপক্ষে এক কৃষকের কাছ থেকে এক টন ধান নিতে হবে। তাহলেই এক গ্রামের ৪ জন কৃষক থাকলে, একটি ট্রাকে করে বা একটি ট্রলারে করে একসঙ্গে ধান গুদামে নিয়ে আসতে সুবিধা হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের গ্রামে গ্রামে গিয়েই ধান পরীক্ষা করতে হবে। না হয় ধান নিয়ে ক্রয় কেন্দ্রে আসবে না কৃষক। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা কৃষকদের সরকারি ক্রয় কেন্দ্র বিমুখ করেছে। এই ইমেজ সংকট কাটাতেই গ্রামে যেতে হবে।’
খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার নতুন করে এই জেলা থেকে ১০ হাজার ৮৪৫ টন ধান কেনার চিঠি পেয়েছেন তারা। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৭৮০ টন,
আগে ছিল এই উপজেলায় ৫৬০ টন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় আগে ছিল ৫৬০ টন, নতুন বরাদ্দ এসেছে ১০৮৬ টন। দোয়ারাবাজারে আগে ছিল ৩৮০ টন, নতুন এসেছে ৬৩৩ টন। ছাতকে আগে ছিল ৪২৯ টন, নতুন এসেছে ৭১৫ টন, জগন্নাথপুরে আগে ছিল ৬০১ টন, এবার এসেছে ১০০২ টন। দিরাই উপজেলায় আগে ছিল ৮৩৯ টন, এবার ১০৬৩ টন বরাদ্দ হয়েছে। শাল্লায় আগে ৬৩৮ টন ছিল, এবার ১০৬৩ টন বরাদ্দ হয়েছে। ধর্মপাশায় আগে ৯২২ টন ছিল, এবার বরাদ্দ হয়েছে ১৫৩৭ টন। জামালগঞ্জে আগে ৭১৫ টন ছিল, এবার ১১৯২ টন বরাদ্দ হয়েছে। তাহিরপুরে আগে ৫৩১ টন ছিল, নতুন বরাদ্দ হয়েছে ৮৮৪ টন। বিশ্বম্ভরপুরে আগে ৩৩৩ টন ছিল, নতুন বরাদ্দ হয়েছে ৫৫৫ টন।
ধানের বরাদ্দ বাড়ানো হলেও এই পর্যন্ত ধান ক্রয়ের হিসাব হতাশাজনক। প্রায় দুই মাসে ধান কেনা হয়েছে ১০৬৫ টন।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, এসব ঘোষণা কাগজে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে দেখা যাবে, ধান কেনার সময় শেষ, ধান কেনা হয়েছে ৫ হাজার টন। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কড়াকড়ি নির্দেশ দিতে হবে। এই সপ্তাহে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এতো টন ধান কিনতে হবে। লটারি দিয়ে ধান কেনা হবে কেন? তাহলে তো ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া হলো। গ্রামে গিয়ে বিগত মৌসুমে কারা চাষাবাদ করেছে, যাচাই করে প্রান্তিক কৃষক যাদের কার্ড আছে, তাদের কাছ থেকে কমপক্ষে এক টন ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
দিরাই উপজেলার শ্যামারচরের বাসিন্দা কৃষকনেতা অমর চাঁদ দাস বলেন, কৃষি অফিসের কৃষক তালিকার অনেকে কৃষি কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। সুতরাং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হলে সকলকে জানিয়ে একদিন গ্রামে এসে বৈঠক করে এবার কারা চাষাবাদ করেছে, তাদের মধ্য থেকে প্রান্তিক কৃষক বের করতে হবে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বলেন, ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা জানিয়ে লাভ কী? ধানতো খুব কম কেনা হচ্ছে। আমার উপজেলায় ১৬০ টন ধান কেনা হয়েছে। খাদ্য গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, আর ২৫ টন কেনার পর গুদামে জায়গা সংকুলান হবে না। অর্থাৎ ১৮৫ টনের বেশি ধান কেনা যাবে না। তাহলে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েও লাভ হচ্ছে না। আমি জেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে বলেছি, গুদামের আগের ধান সরিয়ে ধান কেনার জন্য, তারা এখনো সেটি করেননি।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মোস্তফা জানালেন, আমরা এখন দ্রুত গতিতেই ধান কিনবো। আগে ধান কেনা, এরপর চাল। জেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসকও বলেছেন, আগে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা, এরপর চাল কেনা যাবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষক বোরো চাষাবাদ করেন। এবার বোরো ধানের চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ মে.টন ধান। হাওরাঞ্চলে বৃহস্পতিবার ধানের দাম শুকনো চিকন ৬০০ থেকে ৬২০ টাকা বিক্রয় হয়েছে। অথচ. সরকার ধান কিনবে ১০৪০ টাকা মণে। কৃষকরা জানিয়েছেন, সরকারের ধান কেনার গতি বাড়লেই ধানের মণ এক থেকে দেড়’শ টাকা বেড়ে যাবে।