জেলায় ধান-চাল কেনায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে এবার সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান-চাল কেনায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। ১১ টি খাদ্য গোদামে গত প্রায় দুই মাসে চাল কেনা হয়েছে ১২ হাজার ৬২৫ টন। অথচ. ধান কেনা হয়েছে মাত্র দুই হাজার ২১৩ টন। এই অবস্থায় গত মঙ্গলবার সরকারি নির্দেশনা এসেছে সরকারি খাদ্য গোদাম কর্তৃপক্ষ ধান কিনে চালকলগুলোকে দেবে এবং চালকল কর্তৃপক্ষ এই ধান ভাঙিয়ে সরকারকে সরবরাহ করবে। এদিকে, সুনামগঞ্জের সরকারি খাদ্য গোদামে ধারণ ক্ষমতা আছে ১৯ হাজার টন। সরকার ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টন। এই ধান-চাল একদিকে কেনা হবে, আরেকদিকে অন্য গোদামে সরিয়ে নেবার নির্দেশনাও ২-১ দিনের মধ্যেই আসবে বলে জানিয়েছেন জেলা খাদ্য কর্মকর্তা।
সরকার এবার প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা অর্থাৎ প্রতি মণ ধান ১০৪০ টাকা করে কিনছে। চাল আতব ৩৫ টাকা এবং সিদ্ধ কেনা হচ্ছে ৩৬ টাকা কেজিতে। সুনামগঞ্জ জেলায় ধান কেনা হবে ১৭৩৫৩ টন এবং চাল আতব কেনা হবে ১৭ হাজার ৭৯৮ টন এবং সিদ্ধ কেনা হবে ১৪ হাজার ১৭৯ টন।
গত ২৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ধান-চাল কেনা শুরু হয়। সুনামগঞ্জে কেনা শুরু করতে করতেই ২ সপ্তাহ বিলম্বিত হয়। বুধবার পর্যন্ত জেলার ১২ টি ক্রয় কেন্দ্রে ধান কেনা হয়েছে ২২১৩ টন, চাল আতব ২৮৭ টি মিল থেকে কেনা হয়েছে ৭৫০০ টন। ৩ টি মিল থেকে সিদ্ধ চাল কেনা হয়েছে ৫১২৬ টন।
বেশি করে চাল কেনায় ৫০০ টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জেলার বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা ও শাল্লা খাদ্য গোদামে এখন আর ধান কিনে রাখা যাচ্ছে না।
অন্যান্য খাদ্য গোদামেও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল কিনলে স্থান সংকুলান হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। হাওরের তলানীর উপজেলা শাল্লা, ধর্মপাশা এবং বিশ্বম্ভরপুরে ধান কিনে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় কেনা বন্ধ রয়েছে।
এই উপজেলাগুলোসহ পুরো হাওর অঞ্চলেই ধানের দাম এখনো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম।
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস জানান, সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে স্থানাভাবে ধান কেনা হচ্ছে না। মিলারদেরও ধান কিনতে দেখা যাচ্ছে না। অন্য কিছু ফড়িয়া আছে, তাদের অবস্থা এমন যে, ‘ফালাইদেছতে আমারে দে’ অবস্থা। বৃহস্পতিবারও শুকনো ধান বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৫ শ’ থেকে ৬ শ’ টাকা মণ দরে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বলেন, বার বার বলার পরও গোদাম থেকে আগের চাল এবং নতুন কেনা চাল সরাচ্ছে না খাদ্য বিভাগ। এই অজুহাতে ধানও কেনা হচ্ছে না।
শাল্লা খাদ্য গোদামের ওসি এলএসডি আশিষ কুমার রায় জানালেন, ৫০০ টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন খাদ্য গোদাম। ধান কিনেছি ১৯০ টন। চাল কেনা হয়েছে ৩৯০ টন। ৫৮০ টন ধান-চাল গোদামে ঢুকানোর পর গোদামের ধান-চাল নিয়ে শঙ্কিত আছি, ঝাড়– দেওয়া হচ্ছে না, গোদাম পরিস্কার রাখা যাচ্ছে না। তাতে ধান-চাল নষ্ট হবার আশংকা থাকে।
বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমীর বিশ্বাস বলেন, গোদামে স্থান সংকুলান না হওয়ায় এই উপজেলায় ধান কেনা যাচ্ছে না। গোদাম খালি করার কথা বলা হয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে গোদাম খালি করে ধান না কিনলে প্রয়াজন মেটানোর জন্য কম দামেই প্রান্তিক কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারেন।
তিনি জানান, ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পর উপজেলায় মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কৃষকদের নাম কৃষি অফিসে গিয়ে তালিকাভুক্ত করার জন্য, এরপর লটারি করে কৃষক বাছাই হবে।
বিশ্বম্ভপুরের কৃষক ও গণমাধ্যম কর্মী স্বপন কুমার বর্মণ জানালেন, গরিব-প্রান্তিক কৃষকরা প্রয়োজনের তাগিদেই ধান কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। গোদামে যখন ধান কেনা হবে, তখন ধনি কৃষকরাই ধান দেবে।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জাকারিয়া মোস্তফা জানালেন, গোদামে কেনা ধান চালকল মালিকদের দিয়ে ভাঙানোর নির্দেশ মঙ্গলবার খাদ্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই হয়তো এই ভাঙানো চাল কোথায় পাঠাবো নির্দেশনা আসবে। এখানকার গোদামের ধারণ ক্ষমতা ১৯ হাজার টন। ধান-চাল কেনা হবে প্রায় ৪০ হাজার টন। সেহেতু একদিকে ধান কেনা হবে। আরেকদিকে চাল করে দেশের অন্য স্থানে সরিয়ে গোদাম খালি করা হবে।
তিনি, বিশ্বম্ভরপুর, শাল্লা ও ধর্মপাশা খাদ্য গোদামে ধান কিনে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় ধান-চাল কেনা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে বলেন, শীঘ্রই এসব গোদামে থাকা ধান চাল সরিয়ে গোদাম খালি করে আগে ধান কেনা হবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জে এবার ১২ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে।