জেলা প্রশাসকের জনপ্রশাসন পদক লাভ- এই পদক মুক্তিযুদ্ধ চর্চাকে বেগবান করবে

ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পাঠাগার ও জাদুঘর স্থাপনে কৃতিত্বের জন্য সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো: সাবিরুল ইসলাম এবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাধারণ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন পদক ২০১৮ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। আগামী ২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে তিনি এই পদক গ্রহণ করবেন। মো: সাবিরুল ইসলামের সৃজনশীল উদ্যোগে ইতোমধ্যে জেলার ৩১টি ইউনিয়নে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার স্থাপিত হয়েছে, অবশিষ্ট ইউনিয়নগুলোতেও অচিরেই এরকম জাদুঘর ও পাঠাগার স্থাপনের কাজ শেষ করা হবে বলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। একটি মহৎ কর্মকা-ের স্বীকৃতিস্বরূপ জনপ্রশাসন পদক প্রাপ্তির সংবাদে আমরা অতিশয় আনন্দিত এবং এরূপ কৃতিত্বের জন্য তাঁকে আমরা অভিনন্দন জানাই।
বাঙালি জাতির জন্য ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ এক বিশাল বিস্তৃত এবং বহুমুখী বৈচিত্র ও গৌরবে সিক্ত অধ্যায়। বলা চলে জাতি হিসাবে বাঙালির সবচাইতে মহত্তম কীর্তির নাম এই মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামক এক কিংবদন্তীর মহানায়কের জাদুস্পর্শে এবং তাঁর আদর্শদৃঢ় নেতৃবৃন্দের প্রজ্ঞা-কুশলতায় বাঙালি বিদ্রোহের এক অসাধারণ ইতিহাস রচনা করেছিল এই সময়ে। স্বল্পতম সময়ে বৃহত্তম আত্মদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয় বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অনন্য সাধারণ কীর্তি। জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধ, অর্থাৎ নিপীড়িত জনগোষ্ঠী যাবতীয় শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য জনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। জাতীয় মুক্তির জায়গায় অর্জনের মাত্রা নির্ধারণের বেলায় নানা ধরনের বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু সবচাইতে বড় সত্য হলো বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র নিজের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। জাতির এমন মহৎ কীর্তিকে লালন করা যেকোন প্রজন্মের অপরিহার্য দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। এমন জাতীয় দায়িত্ব পালনে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সফলতার বিষয়টি জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়ায় এই ধরনের চর্চার সম্প্রসারণই ঘটাবে যা সর্বাবস্থায় সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাদুঘর ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সাথে বর্তমানের মিতালী পাতিয়ে দেয়। জাদুঘরে দাঁড়িয়ে আজকের মানুষ সুদূর অতীতের দৃশ্যাবলী অবলোকন করতে পারে, ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো দেখে অনুধাবন করতে সক্ষম হয় কোন কোন প্রক্রিয়া ডিঙিয়ে সে আজকের পর্যায়ে আসতে পেরেছে। পাঠাগারও তদ্রুপ। পাঠাগার যে কোন অর্থে জ্ঞানরাজ্যে বিচরণের এক আনন্দলোক। বিশেষায়িত পাঠাগার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পাঠাগার আমাদের বহু বিস্তৃত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মুক্তিযুদ্ধকে জানতে বুঝতে সহায়তা করে। ইতিহাসবিচ্ছিন্ন কোন জাতিই অগ্রগতির সঠিক পথে থাকতে পারে না। তাই পৃথিবীর সকল সভ্য জাতি নিজের ইতিহাসকে সযতেœ সংরক্ষণের প্রয়াস গ্রহণ করে। আমাদের দেশে একটা সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেয়ার প্রবল আয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। আজ অবস্থা পালটেছে। বিশেষভাবে পাঠের জন্য বিষয় হিসাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এখন সকল শ্রেণির পাঠকের কাছে ক্রমশ সমাদৃত হয়ে উঠছে। মানুষের এই পাঠ আকাক্সক্ষাকে পূর্ণতা দিতে পাঠাগারের জুরি আর কিছু নেই। সুতরাং জেলা প্রশাসক সবগুলো ইউনিয়নে পাঠাগার ও জাদুঘর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে বর্তমান প্রজন্মের মেলবন্ধন স্থাপনে যে অবদান রেখেছেন সেটি অবশ্যই তাৎপর্যম-িত।
যেসব জাদুঘর ও পাঠাগার বিভিন্ন ইউনিয়নে স্থাপিত হয়েছে এবং যেগুলো ভবিষ্যতে স্থাপিত হবে, তার সবগুলোই যাতে বর্তমান প্রজন্মের জানার পরিধি বিস্তারে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় সেটি নিশ্চিত করা সবচাইতে জরুরি। পাঠাগার ও জাদুঘরগুলো প্রাণবন্ত এবং অর্থবহ হবে তখনই যখন এগুলো পাঠক-দর্শকের ভিড়ে ঠাসা থাকবে। আমরা জেলা প্রশাসকের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও বহুমুখী সৃজনশীলতা কামনা করি।