জেলা সাহিত্যমেলা/ পুরো দেশের সাহিত্যচর্চাকে এক সুতোয় গাঁথতে হবে

চমৎকার পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ২ দিন ব্যাপী জেলা সাহিত্য সম্মেলন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি জেলা শিল্পকলা একাডেমীর হাছনরাজা মিলনায়তনে পরিপূর্ণভাবে সাহিত্যিক আবহের তৈরি হয়েছিলো। মেলার উদ্বোধক স্বনামখ্যাত কবি-গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিকের আকর্ষণীয় ও তথ্যবহুল মূল্যবান আলোচনা উপভোগের পর প্রবন্ধ পাঠ-আলোচনা, লেখক আড্ডা, কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, গুণিজন সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো পর্বগুলো উপস্থিত সুধী-সাহিত্যিক সমাজ উপভোগ করেছেন একান্ত আগ্রহ নিয়ে। জেলায় জেলায় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন বর্তমান সরকারের জাতিগঠন কর্মকা-ের মধ্যে এক নতুন অনুষঙ্গ। সাহিত্য সমাজমানস যেমন তৈরি করে তেমনি সমাজমানসও প্রবলভাবে প্রভাবিত করে সাহিত্যকে। সাহিত্যচর্চা তাই জাতি গঠনে এক অবিকল্প উপকরণ। একটি দেশের ভিতর সব জায়গায়ই সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ধারা বহমান থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজধানীর বাইরের যে বিশাল বাংলাদেশ, সেই জায়গার সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা সারা দেশে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় না। কেবল মফস্বলে অবস্থানের কারণে কত গুণী ও যোগ্যতাসম্পন্ন সাহিত্যিকের অমর সৃষ্টিসম্ভার লোকচক্ষুর অন্তুরালে থেকে যাচ্ছে তার হিসাব মিলানো কঠিন। সারা দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চাকে সমান্তরাল অবস্থানে নিয়ে আসার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। এরকম এক পরিস্থিতিতে প্রত্যেক জেলায় সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনের সরকারি উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
সুনামগঞ্জের সাহিতমেলা আয়োজনের মধ্যে সুরূচিবোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। জেলার যে সাহিত্যিকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা সকলেই স্বতস্ফূর্ত ও আন্তরিক ছিলেন। ফলে অনুষ্ঠানটি গুরুগম্ভীর নিরস অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক প্রাঞ্জল অনুষ্ঠানে পরিণত হতে পেরেছে। এটি সাহিত্যমেলার বিশেষ ইতিবাচক দিক। পুরো অনুষ্ঠানে খামতির দিক যেটি ছিলো তা হলোÑ জেলার সাহিত্যের ইতিবৃত্ত নিয়ে যে ৩টি প্রবন্ধ পঠিত ও আলোচিত হয় হয় প্রথম দিনে তার জন্য বরাদ্দ সময় ছিলো কম। ফলে প্রাবন্ধিক ও আলোচকরা ছিলেন অস্বস্তিতে। ভবিষ্যতে এদিকে দৃষ্টি রাখা হবে বলে আশা করি। এই ধরনের ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আলোচনাপর্বের জন্য বিশেষ চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
সাহিত্যচর্চাকে জাতির মনন তৈরির সাথে সম্পর্কিত করাটা একেবারেই আবশ্যকীয়। বাংলা সাহিত্যচর্চার ইতিহাস যেমন প্রাচীন তেমনি ঐতিহ্যম-িত। এই ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল জয় করেছেন। বহু বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। আমাদের কালজয়ী সাহিত্যিকরা বাংলা ও বাঙালির পরিচয়কে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছেন। বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্যিকদের দায়িত্ব হলো এই ধারাকে আরও অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, বাংলা সাহিত্য চর্চার যে অগ্রসরমান রূপ আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তা পূরণ হয়নি। এর একটি প্রধান কারণ হিসাবে আমরা মনে করি পুরো দেশের সাহিত্যচর্চাকে এক সুতোয় গাঁথতে না পারার ব্যর্থতা। দেরিতে হলেও বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। তাই তাঁরা পুরো দেশকে এক ছাতার নিচে আনার লক্ষ্যে সাহিত্যমেলা আয়োজনের কাজটি শুরু করেছে। এই কর্মকা-কে নিয়মিত ও সমৃদ্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে আঞ্চলিক সাহিত্য চর্চার সমন্বিত অবয়বই জাতীয় সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বশীল চেহারা। এই বিশাল জায়গাকে অস্বীকার করে সুযোগ-পাওয়া রাজধানীর কিছু সাহিত্যিকদের দ্বারা ওই চেহারার ¯িœগ্ধতা পরিপূর্ণ হয় না। সাহিত্যকে আমরা যে গণমুখী, যুক্তিমনস্ক, আধুনিক, ও প্রগতিশীল জায়গায় দেখতে চাই তা অর্জনের জন্য পুরো দেশকেই বিবেচনায় রাখতে হবে। তাহলে আমরা যেমন মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির দেখা পাব তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমে জাতি গঠনের আকাক্সক্ষারও পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটবে।
সুনামগঞ্জের সুসমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বাংলা সাহিত্যের মূল ধারায় সংযুক্ত রাখতে বছর ব্যাপী এমন কর্মকা-ের প্রচলন আমাদের কাম্য। এ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। সকলের আবশ্যিক দায়িত্বও এটি।