জোনভিত্তিক করোনা ব্যবস্থাপনা ও করণীয়

জেলা সিভিল সার্জন জেলাধীন সবগুলো এলাকাকে লাল, হলুদ ও সবুজ– এই তিন অঞ্চলে ভাগ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন মঙ্গলবার। সংক্রমক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ এর ক্ষমতাবলে তিনি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ অনুসারে জেলার প্রতিটি অঞ্চলকে ওই তিনভাগের প্রযোজ্য অংশের অন্তর্ভুক্ত করে জনসাধারণের আচরণীয় নীতিমালা অবহিত করেছেন। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিবৃন্দ স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধানে জনসাধারণকে নীতিমালা মেনে চলতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সিভিল সার্জন জেলাধীন সুনামগঞ্জ ও ছাতক পৌরসভার সমগ্র অঞ্চলসহ মোট ১৫টি এলাকাকে আপাতত রেড জোন ঘোষণা করেছেন। বিজ্ঞপিত নীতিমালা অনুসারে রেড জোনভুক্ত এলাকায় গণপরিবহন, দোকানপাট ও অফিস বন্ধ থাকবে। অতিপ্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বেরোতে পারবেন না। রেডজোন এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। করোনা মহামারীর অতিসংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির এই নতুন ব্যবস্থাপনা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা দেখতে আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে জনসাধারণের মধ্যে এই জোন বিভাজন ও করণীয় নিয়ে প্রচুর বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রেড জোন এলাকায় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না সে নিয়ে প্রচুর সংশয় দেখা যায়। যেকোনো নতুন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে এমন প্রশ্ন তৈরি হয়। যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন তারাও নানা সংশয়ের মধ্যে থাকেন। তবে একটু একটু করে সকলেই নতুন নিয়ম আত্মস্থ করে ফেলেন। আমরা আশা করি রঙ ভিত্তিক বিভাজিত এলাকাগুলোও নতুন নিয়মের আওতায় তাল মিলিয়ে নিবে।
রেডজোনভুক্ত শহর এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। আমরা জানি শহরাঞ্চলে প্রচুর নিম্ন ও দৈনিক আয়ের মানুষ বসবাস করেন। এই শ্রেণিটি লকডাউনের শুরু থেকেই অভাবে পতিত হবেন। সরকারি ভাষ্যে জানা যায়, এমন অভাবগ্রস্তদের লকডাউনকালে সহায়তা দেয়া হবে। সুনামগঞ্জ ও ছাতক পৌর এলাকায় এরকম প্রান্তিক লোকজনের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে কেমন সহায়তা দেয়া হবে সেটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। গত তিন মাসে দেখা গেছে, করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়েও মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েছে। বহু নজরদারি সত্বেও মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি । এর পিছনে বড় কারণ হলো, মানুষের অভাব। অভাবের তাড়নায় মানুষকে বাইরে আসতে হয়েছে। সুতরাং প্রান্তিক মানুষের অভাবকে উপেক্ষা করে রেড জোনকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। সহায়তা ছাড়া শুধু কঠোরতা দেখালে করোনার সাথে ক্ষুধার ভয়াবহতাও বিস্তৃত হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার এই টানাপোড়েন সমাধানের জন্যই সরকার সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়েছিলো। এখন দেখা যায়, একদিকে ঠিক করতে চাইলে অন্য দিকটি ভারসাম্যহীন হয়ে উঠে। সত্যিই এক ভয়ংকর সময় পার করছি আমরা।
শহরের রেডজোন এলাকায় নিত্যপণ্য ও ঔষধের দোকান বন্ধ রাখা হবে বলে সিভিল সার্জনের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব পণ্য হোম ডেলিভারির মাধ্যমে সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনাটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার স্পষ্টায়ন করা হয়নি। এই নির্দেশের কারণে শহরের মানুষরা খুব বিপদে পড়বেন বলে অনুমান করা যায়। তাই নিত্যপণ্য ও ঔষধ সংগ্রহের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
করোনা এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা যেমন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন অতিশয় কঠিন তেমনি এর কার্যকারিতাও সন্দেহাতীত নয়। সবচাইতে জরুরি বিষয় হলো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত শনাক্ত করে আক্রান্তদের আলাদা করে ফেলা। অনাক্রান্তদের রক্ষা করতে হলে তাদের আক্রান্তদের থেকে দূরে রাখতে হবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন সেন্টারের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। সরকারকে আপৎকালীন অস্থায়ী ভাবনা চিন্তা থেকে সরে এসে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থার চিন্তা করতে হবে।
রেড জোন ঘোষিত এলাকার জনসাধারণকে আমরা সরকারি বিধি বিধান মেনে চলার আহ্বান জানাই।