জ্যৈষ্ঠ মাসেও মাছের আকাল- খামারের মাছই ভরসা

স্টাফ রিপোর্টার
হাওর প্রধান সুনামগঞ্জ জেলায় জ্যৈষ্ঠ মাসেও চলছে মাছের আকাল। ধান কাটা শেষে ইতোমধ্যে জেলার একাধিক হাওরে নদীর পানি ঢোকানো হলেও মাছ পাচ্ছেন না স্থানীয় জেলেরা।
হাওর ও নদীতে ধরা বা শিকার করার দেশীয় মাছ না থাকায় জেলা-উপজেলা সদরসহ গ্রামের বাজারগুলোও চাষের মাছে সয়লাব। চাষের হলেও বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এসব মাছ। আসন্ন রমজানে বাজারে মাছের চাহিদা বাড়বে। তখন দেশীয় মাছের অভাবে চাষের মাছের ব্যাপক মূল্য বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করেছেন ক্রেতারা।
হাওরের জেলায় মাছের আকালের বিষয়ে সচেতনমহল ও মাছ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতিমালা অনুযায়ী সেচ পাম্প বা অন্য কোন প্রক্রিয়ায় জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরা আইনত দ-নীয় অপরাধ হলেও আইন মানা হয়না কোথাও। ছোট বড় সকল জলমহালই শুকিয়ে মাছ ধরা হয়। কোথাও কোথাও মাটি খুড়ে মাছ ধরে মাছ শিকারীরা। কিন্তু জেলা মৎস্য বিভাগ রহস্যজনক কারণে নিরব ভুমিকা পালন করে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত হাওরে মৎস্য নিধন যজ্ঞ চলায় এই জেলায় মাছের আকাল তৈরি হয় বলে অভিমত সচেতন মহলের।
একাধিক জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, কয়েকটি হাওরে নদীর পানি প্রবেশ করলেও দেশীয় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। যারা কিছু মাছ ধরেন তারা নিজেদের চাহিদা মেটান। বিক্রি করার মত মাছ এখনও হাওরে ধরা পড়ে না। ফলে পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, গ্রাসকার্প, সিলভারকার্প, বিগ্রেড, সরপুটিসহ অন্যান্য মাছ বাজারে নিয়মিত বিক্রি হয়। ক্রেতারা দেশীয় মাছ খোঁজলেও না পেয়ে বাধ্য হয়েই চাষের বিদেশী মাছ ক্রয় করেন। হঠাৎ করে দু’একজন দেশী মাছ বাজারে নিয়ে এলেও ক্রেতা বেশী থাকায় দাম থাকে আকাশচুম্বী।
হাওরাঞ্চলে দেশী মাছ না পাওয়া যাওয়ায় ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই ট্রাক বোঝাই করে সুনামগঞ্জে পাঙ্গাস মাছ আসে বলে জানিয়েছেন একাধিক মাছ ব্যবসায়ী।
বুধবার মাছের বাজার ঘুরে জানা যায়, পাঙ্গাস প্রতি কেজি ১২০-১৩০ টাকা, তেলাপিয়া প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, রুই প্রতি কেজি ৩০০-৩২০ টাকা, কাতলা প্রতি কেজি ২০০-২২০ টাকা, গ্রাসকার্প প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, সিলভারকার্প প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বিগ্রেড প্রতি কেজি ১০০-১২০ টাকা, সরপুটি ২২০-২৫০ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে। তবে এসব চাষের মাছের দাম আমদানীর উপর কমে-বাড়ে।
পৌরসভার কিচেন মার্কেটের মাছ ব্যবসায়ী রবিল মিয়া বলেন,‘আমরা চাই দেশী মাছ ক্রয় করে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করব। কিন্তু উপায় নেই, নদী ও হাওরে দেশী মাছ পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়েই বাহির থেকে চাষের মাছ আমদানী করি। ক্রেতারা দেশী মাছ না পেয়ে ঘুরাঘুরি শেষ পর্যন্ত চাষের মাছই নেন।’
ষোলঘর পয়েন্টের মাছ ব্যবসায়ী যোগেন্দ্র দাস ও হরেকৃষ্ণ দাস বলেন,‘সব লোকই বাজারে এসে দেশী মাছ খোঁজেন। কিন্তু সারাদিন হাওরে ঘুরেও দেশী মাছ পাওয়া যায় না, তাই বাধ্য হয়েই পুকুরের মাছ আনতে হয় আমাদের। দেশী মাছের দামও অনেক বেশী। আমরা নিজেরাই পুকুরের মাছ খাই। ’
হাজীপাড়া মাছ ক্রেতা সুমন মিয়া বলেন,‘আমরা বাজারে আসি দেশী মাছ কিনতে, কিন্তু বাজারে সেই মাছ পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়েই চাষের মাছ কিনতে হয় সবার।’
ওয়েজখালী পয়েন্টের এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন,‘ চৈত্র মাসে এবছর বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে দেশী মাছ একটু কম পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি সবাই হাওরের বাঁধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কেউ জলমহালের দিকে নজর দেয় নি। এই সুযোগে ইজারাদাররা ইচ্ছাখুশি পাম্প দিয়ে সেচে জলমহালগুলোর মাছ ধরেছে। ফলে হাওরে পানি হলেও দেশী মাছ না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। ’
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের তাহিরপুরে বাসিন্দা লিটন মিয়া বলেন,‘ চৈত-কাতি বার মাসই বাজারে পাঙ্গাস মাছ বিক্রি হয়। তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস মাছ না থাকলে মানুষ লবণ দিয়া ভাত খাইলনে। পুকুরের মাছই মানুষের জান বাচাইছে। হাওরের মাছের অনেক দাম। ’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,‘ এখন মাছের প্রজনন মৌসুম। তাই মাছ আহরণ একটু কম হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া শুকনো মৌসুমে সকল খাল-বিল, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমেছে। কিছু কিছু হাওরে পানি ঢুকলেও সকল হাওর প্লাবিতও হয়নি। তবে বর্ষাকালে হাওরে প্রচুর পরিমাণ মাছ পাওয়া যাবে। ’
শুকনো মৌসুমে জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার বিষয়ে তিনি বলেন,‘ সুনামগঞ্জ বিশাল হাওর এলাকা। সবদিক নজরদারি ও দেখাশুনা করা বেশ কঠিন। তবে যখনই কোন এলাকার জলমহাল শুকানোর অভিযোগ পেয়েছি, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। উপজেলা মৎস্য বিভাগও স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে।’