ঝুঁকিপূর্ণ বেইলী সেতু, ভারি যানের অবাধ চলাচল ধসে পড়ার শঙ্কা

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘সাবধান ঝুঁকিপূর্ণ বেইলী সেতু, পাঁচ টনের অধিক যানবাহন চলাচল করা নিষেধ।’ সাচনা বাজার-সুনামগঞ্জ সড়কের যে কয়টি বেইলী ব্রিজ আছে সবক’টির প্রবেশ মুখে এমন সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড সাটানো রয়েছে। সুনামগঞ্জের সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর নির্বাহী প্রকৌশলীর আদেশ সম্বলিত সাইনবোর্ডের তোয়াক্কা না করে চরম ঝুঁকি নিয়েই প্রতিনিয়ত সেতু পার হচ্ছে ভারী যানবাহন। কোন নজরদারি না থাকায় রাতের আঁধারে মালবাহী বিশাল ট্রাক আসা-যাওয়া করছে। চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও সাচনা বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ট্রাকভর্তি মালামাল বাজারে নিয়ে আসছে।
সক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণেরও বেশি মালামাল নিয়ে যাতায়াতকারী এসব যানে যেকোন সময় ব্রিজ ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে যানমালের ক্ষতিসহ মূল্যবান জীবন বিলীনের পাশাপাশি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করার আশংকা রয়েছে। গত প্রায় তিন বছর আগে ঢেউটিন ভর্তি ট্রাকের অসহনীয় ভারে সড়কের শালমারা অংশের বেইলী সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পরে জোড়াতালির মেরামতে যাতায়াত স্বাভাবিক হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ দিয়ে ফের অধিক পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। স্বাভাবিক চলাচলের ঝুঁকি এড়াতে লোড নিতে অক্ষম এমন যানবাহনের যাতায়াত বন্ধ করতে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ সচেতন যাত্রী ও চালকসহ সকলের।
সুনামগঞ্জ-সাচনা বাজার সড়ক একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। জেলা শহরের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী এ সড়ক দিয়ে বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুরসহ ৫-৬টি উপজেলার প্রায় কয়েক লক্ষাধিক মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াত করে থাকে। এ সড়কের কুকড়াপশী, শালমারা, নিয়ামতপুর-ইচ্ছারচড় অংশের ৩টি বেইলি ব্রিজসহ দেবে যাওয়া ঢালাইকৃত একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ রয়েছে। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এর একটি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ওই সময় সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী রতন পালের মালিকানাধীন অর্নব ট্রেডার্সের টিন বহনকারী ট্রাক শালমারা বেইলী ব্রিজ পাড়ি দিতে গিয়ে দুমড়েমুচড়ে পানিতে নিমজ্জিত হয়। পরে কয়েকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টায় সড়কটি চালু হয়।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, টিন, রড, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, সার-বীজ, ফলমূল, মোদী মালসহ সব ধরনের ভারি মালামাল নিয়ে বিশালাকার ট্রাক প্রায় প্রতিনিয়তই সুনামগঞ্জ সড়কের বেইলী ব্রিজ হয়ে সাচনা বাজারে প্রবেশ করছে। কর্তৃপক্ষের আদেশ নির্দেশ উপেক্ষা করে দিনের পর দিন চরম ঝুঁকি নিয়েই ব্রিজ পার হচ্ছে অধিক ওজনের ভারি মাল বহনকারী ট্রাক। এই ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কারও কোন নজরদারি নেই।
সাচনা বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী নিজেদের নাম না ছাপার শর্ত দিয়ে বলেন, সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে যে কয়টা বেইলী ব্রিজ আছে সেগুলো অধিক পণ্যবাহী যান চলাচলের সক্ষমতা রাখে না। তারপরও ট্রাক ভর্তি করে দিনে রাতে যেভাবে মাল আসছে তাতে ব্রিজ ভেঙে পড়ার আশংকা রয়েছে। বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা এসব মাল আনেন তারা ইচ্ছে করলে নৌকায় আনতে পারেন। কিন্তু তারা সময় বেশি লাগবে বিধায় ট্রাকেই নিয়ে আসেন। এটা আসলে ঠিক না। ব্রিজ ভেঙে গেলে সকলকেই সমস্যায় পড়তে হবে। এ বিষয়টাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সাচনা বাজারের মোটরসাইকেল চালক আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে যে ষ্টীলের ব্রিজগুলো আছে তার একটা ভেঙে গেলেই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ জরুরী প্রয়োজনে দ্রুত সুনামগঞ্জে যেতে পারবে না। তখন আমাদের রোজগারও কমে যাবে। বেইলী ব্রিজ দিয়ে যাতে বড় কোন ট্রাক না আসতে পারে সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
নিয়মিত সুনামগঞ্জ যাতায়াত করা সাচনা বাজারের পার্শ্ববর্তী পলক গ্রামের বাসিন্দা মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই মাল বোঝাই বড় ডিস্ট্রিক্ট ট্রাক সাচনা বাজারে প্রবেশ করছে। এই ট্রাকগুলো সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের ৩-৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পার হয়ে বাজারে ঢুকে। তাই যেকোন সময় ব্রিজ ভেঙে যাত্রীসাধারণকে মারাত্বক দুর্ভোগে পড়তে হবে। দুই আড়াই বছর আগেও শালমারার ব্রিজ ভেঙে কয়েকদিন যাতায়াত বন্ধ ছিল। এখন বাধাহীনভাবে বড় বড় ট্রাক যে রকম আসা-যাওয়া করছে তাতে ব্রিজ ভেঙে ভোগান্তি বাড়লে এর দায় কে নেবে?
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বললেন, কেউ নির্দেশনা মানে না। আমাদের পক্ষেও ২৪ ঘণ্টা দেখভাল সম্ভব নয়। যখন ভাঙবে তখন সকলই বিপদে পড়বে। এসব বেইলী ব্রিজের ডিজাইন তৈরি করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ডিজাইন তৈরি হলে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে। এরপর প্রকল্প অনুমোদন হলে ব্রিজের কাজের দরপত্র হবে।