টাঙুয়া ফিরে পাক হারানো রূপ ও বৈশিষ্ট্য

টাঙুয়ার হাওরকে একান্ত বিশ্রামে পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন কবি ও লেখক ইকবাল কাগজী। গত মঙ্গলবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এই আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই হাওরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত অর্ধ দশক হাওরটিকে বিশ্রামে পাঠানো প্রয়োজন। এই সময়ে কোনোভাবেই হাওরকে বিরক্ত করা যাবে না বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেছেন। মানুষের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে মৎস্যবতী এই বিপুলা হাওরকে মৎস্যহীনা করে ফেলা হয়েছে। হারিয়ে গেছে এর বৃক্ষরাজির সমৃদ্ধ ভা-ার। নানা জাতের পাখিদের কলতানে হাওরের একান্ত নির্জনতা এখন আর ভাঙে না। মানবিক, যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আগ্রাসনে প্রায় কোটি বছরের পুরনো এই হাওরকে কবরস্ত করার উপক্রম করেছি আমরা। এখন শোনা যাচ্ছে নতুন আকারে ও প্রকারে এখানে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এই সময়ে একজন বিশিষ্ট চিন্তকের হাওর বাঁচানোর এই আকুতি বিশিষ্টতা ও মনোযোগ দাবি রাখে অবশ্যই। অতীতের কাজের পূর্ণ মূল্যায়ন করে নতুন প্রকল্পের প্রকৃতি নির্ধারণ করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।
লেখক হাওরকে নির্জন একান্ত বিশ্রামে পাঠানোর যে দাবি তুলছেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা কি বাস্তবায়ন করা সম্ভব? অক্ষরে অক্ষরে যদি সম্ভব নাও হয় তাহলে কতটুকু ছাড় দেয়া হলে হাওরের পূর্ব বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা যাবে? হাওরকে পূর্ব বৈশিষ্ট্যে ফিরিয়ে আনার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা, মিঠা পানির মাছের উৎপাদন, প্রাণী ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণে টাঙুয়ার আগের অবদান কি এখনও আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য জরুরি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের উপরই নির্ভর করে ভবিষ্যতে টাঙুয়াকে আমরা কোন রূপে দেখতে চাই তার স্বরূপ। মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ ও লালসার কাছে প্রকৃতি পরাভূত। প্রকৃতি এই পরাভব নিরবে মেনে নেয় না। উল্টো প্রতিশোধ নেয়। সেই প্রতিশোধের ভয়াবহতার কাছে মানুষই আবার অসহায় হয়ে যায়। যে প্রকৃতি মানুষকে রক্ষা করে চলে মায়ের স্নেহ আর ভালবাসা দিয়ে সেই প্রকৃতিকে যখন আমরা রুষ্ট করি তখন একসময় সে প্রত্যাঘাত করবে, এই প্রাকৃতিক নিয়মকে ভুলে বসে আছি বলেই আজ প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা।
টাঙুয়াকে বিশ্রামে পাঠানোর অর্থ হলো একটা নির্দিষ্ট সময় টাঙুয়ায় কোনো মানুষের প্রবেশ ঘটবে না। এটি নিতান্ত অসম্ভব হলে, সীমানা ঠিক করে দিতে হবে কতটুকু পর্যন্ত মানুষের বিচরণ গ্রহণযোগ্য হবে এবং হাওরে মানুষ কী করবে। টাঙুয়াভিত্তিক পর্যটন সম্ভাবনাকে কার্যকর রাখতে ন্যূনতম একটি এলাকাকে উন্মুক্ত রাখতে হবে। এর বাইরে পুরো হাওরকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সেখানে যাবতীয় মাছ ধরাসহ যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। কাগজপত্রে নিষিদ্ধ করলেই চলবে না, বাস্তবেও এমনটি যাতে হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এই বিশ্রামকালে প্রাকৃতিক নিয়মে টাঙুয়া ধীরে ধীরে তার হৃত রূপের পুনরুদ্ধার ঘটাবে। একটা সময় পর (হতে পারে সেটা অর্ধ দশক কিংবা পুরো এক দশকই) আমরা টাঙুয়াকে আবারও মৎস্যবতী, বৃক্ষ-লতাগুল্মসজ্জ্বিত, পাখির কলকাকলিতে ভরা অপরূপ শোভায় দেখতে পাব। আর কেবল তখনই বলা সম্ভব ফিরে পেয়েছি আমরা ভালবাসার হাওর।
প্রকল্প-বাস্তবায়নজনিত দুর্বলতাকে পুঁজি করে জলসর্দার কিংবা প্রভাবশালী একটি পক্ষ ইজারাপ্রথার পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। সেই প্রচেষ্টা সবসময়ই চালু ছিলো, আছে ও থাকবে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না টাঙুয়া কারও পকেট ভারী করার উপকরণ নয়। এ হলো সুজলা বাংলার মেরুদণ্ড। এই হাওর রক্ষা পাওয়ার অর্থ পুরো হাওরাঞ্চলে মৎস্যসম্পদের সমৃদ্ধি। একইভাবে এর উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র আরেক অতুলনীয় সম্পদরাশি। সুতরাং সামনের দিনে আমরা এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখতে চাই যার মধ্য দিয়ে টাঙুয়া ফিরে পাবে তার হারানো রূপ ও বৈশিষ্ট্য।