টাঙ্গুয়ার হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ হবে না

বিশেষ প্রতিনিধি
জীববৈচিত্র্যের লীলাভূমি দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের সীমানার ভেতর আর কোন ফসল রক্ষা বাঁধ হবে না। এমনকি গেলবছর ভেঙে যাওয়া নজরখালি বাঁধে এবার কোন কাজও হবে না। হাওরের একপাশ দিয়ে যাওয়া গুরমা এক্সটেনশন বাঁধের অ্যালাইনমেন্টও সরিয়ে নেওয়া হবে। শনিবার দিনভর হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মনিটরিংয়ের জন্য গঠিত জেলা কমিটির দায়িত্বশীলরা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগরের টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দেখেন। পরে বিকেলে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তারা।
টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহিৃত দেশের অন্যতম বৃহৎ এই জলাভূমি। শীতকালে এই জলভূমিতে লাখো লাখো অতিথি পাখি আসে। এই হাওরটি ফসলের হাওর হিসেবেও চিহিৃত নয়। গেল বছর হাওরের নজাখালি খালে বড় আকারের হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন জেলা হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং মনিটরিংয়ের জন্য গঠিত উপজেলা ও জেলা কমিটি।
শনিবার সকাল থেকে দিনভর টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ ও গুরমা এক্সনেশন বাঁধের তাহিরপুরের সীমানা থেকে মধ্যনগর পর্যন্ত ঘুরে দেখেন জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার, জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম, কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ানসহ কমিটির বেসরকারি সদস্য ও জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মীরা। এসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে হাওররক্ষা বাঁধের কাজ করতে আরও সংবেদনশীল ও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান স্থানীয় লোকজনও।
হাওরের গোলাভারী গ্রামের তরুণ কবির আহমদ বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওর পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। কান্দা কেটে সামান্য ফসল রক্ষার জন্য হাওরের নজরখালি এলাকায় এক্সেভেটর ঢুকিয়ে বাঁধ নির্মাণ করায় পরিবেশকর্মীরা গতবছর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই বাঁধটি হলে হাওরে স্বাভাবিকভাবে পানি ঢুকতে বাঁধা সৃষ্টি হয়।
একই গ্রামের সবুজ মিয়া বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গুরমা এক্সটেনশন বাঁধটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই বাঁধটি অনেক চেষ্টা করেও গত বছরের আগাম বন্যার সময় আটকানো যায় নি। এবারও একইভাবে বাঁধ দিলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।
পাঠাবুকা গ্রামের জুনায়েদ আহমদ বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গুরমা এক্সটেনশন বাঁধটি স্থান পরিবর্তন করলে কিছু কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন। কিন্তু বাঁধ আটকাতে হলে এখান থেকে বাঁধ সরিয়ে নিতেই হবে। তবে বাঁধটি হাওরপাড়ের ওয়াচ টাওয়ার থেকে ভবানীপুর এবং ভবানীপুর থেকে লামাগাঁও পর্যন্ত কাজ করতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার অন্তর্ভুক্ত জলাভূমি। এখানে ধান চাষ করতে সহযোগিতা বা উৎসাহ দেওয়া হয় না। কৃষকরা নিজস্ব উদ্যোগে ৫০ হেক্টরের মত জমিতে ঝুঁকি নিয়ে ধান চাষ করেন। এই হাওরের নজরখালিতে গত বছর বাঁধ দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানালেন, গত বছর টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালিতে বাঁধ হয়, যা নিয়ে পরে সমালোচনা হয়। এছাড়া টাঙ্গুয়ার হাওরের গুরমা এক্সটেনশনে ২২ টি পিআইসির মাধ্যমে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ হয়েছিল। অকাল বন্যায় এই বাঁধের ১০-১২ অংশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এরমধ্যে দিন রাত চেষ্টা করেও তিনটি অংশ রক্ষা করা যায় নি। ভেঙে হাওর ডুবেছে। এজন্য এবার আগের করা বাঁধের স্থান পরিবর্তন করে নতুন অ্যালাইনমেন্টে কাজ হবে। এখন জয়পুর (ওয়াচ টাওয়ার) থেকে ভবানীপুর এবং ভবানীপুর থেকে লামাগাঁও পর্যন্ত বাঁধের কাজ হবে।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, হাওরের অপ্রয়োজনীয় ফসলরক্ষা বাঁধও হচ্ছে। এ ধরণের কিছু বাঁধের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধের কথা ওঠে এসেছে। এবার নজরখালিতে বাঁধ হবে না। গুরমা এক্সটেনশনের অ্যালাইনমেন্টও পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই বাঁধটি গত বছর আটকানো যায় নি। এ নিয়ে টেকনিক্যাল পার্সনরা কাজ করছেন।