টেংরাটিলায় গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ১৪ বছর, বহুজাতিক কোম্পানি নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে

টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণের ১৪ বছর পরেও এলাকার পরিবেশ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বরং গত ১৪ বছর যাবৎ ক্রমাগত দূষণের শিকার হয়ে আছে গ্যাসফিল্ড পার্শ্ববর্তী একটি বড় অঞ্চল। ২০০৫ সনের ৭ জানুয়ারি প্রথম বিস্ফোরিত হয়েছিল গ্যাসক্ষেত্র। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটে একই বছরের ২৪ জুন। এই দুই দফা বিস্ফোরণের ফলে পুরো খনি এলাকার মজুদ গ্যাসসম্পদ ধ্বংস হয়ে পড়ে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্যাসের মূল্য টাকার অংকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বহুজাতিক কোম্পানি নাইকোর অদক্ষতা ও অবহেলার কারণেই এই বিশাল ক্ষতি সংগঠিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মতামতে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ক্ষতিপূরণের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও আন্তর্জাতিক কৌশলে সেই মামলা এখনও ঝুলে আছে। এদিকে ওই বিস্ফোরণের ক্ষতি এখনও বয়ে চলেছে টেংরাটিলা এলাকার মানুষ। মজুদ গ্যাস পোড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করলে ক্ষতির অংক হবে বিশাল। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গ্যাসকূপ বিস্ফোরণ জনিত প্রতিক্রিয়ায় ওই এলাকার মানুষ ব্যাপকভাবে আসের্নিকসহ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বিনষ্ট হয় গাছ-গাছালি, ঘরবাড়ি, পশু-পাখি ও ফসলি জমি। প্রকৃতির স্বাভাবিক চরিত্রের বিচ্যুতি ঘটেছে এলাকায়। এখনও উপদ্রুত অঞ্চলে নানা স্থান দিয়ে বুদবুদের আকারে গ্যাস উদগিরিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিভাগের তথ্যমতে এলাকাতে আর্সেনিক আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ৬২ জন। এই তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তালিকার বাইরে আরও কত ক্ষতিগ্রস্ত লোক রয়েছেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে তা বেরিয়ে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো এই বিস্ফোরণে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব প্রকট।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদেশের গ্যাসসম্পদকে রক্তচোষা ড্রাকুলার মত শুষে নিতে তৎপর। এরা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা দ্বারা কম খরচে ও ন্যূনতম নিরাপত্তা বিধান ছাড়াই মূল্যবান গ্যাস আহরণ করে মুনাফার মোটা অংশ হাতিয়ে নিতে ওস্তাদ। শুধু যে টেংরাটিলায় বিস্ফোরণ ঘটেছে তা নয়। এর আগে মাগুরছড়ায় শ্যাভরন নামের আরেকটি কোম্পানির অদক্ষতার কারণে ২০ হাজার কোটি টাকার গ্যাসসম্পদ বিনষ্ট হয়। হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রের পরিত্যক্ত কূপ থেকে উদগিরিত হয়ে গ্যাস অপচয়ের ঘটনা ঘটছে। আমরা আমাদের মূল্যবাদ খনিজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। পারিনি বলেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্যায্য শর্তের বেড়াজালে ফেলে আমাদের জাতীয় সম্পদের বিলুপ্তি ঘটিয়েও দীর্ঘদিন যাবৎ বুক ফুলিয়ে বসে থাকতে পারছে।
টেংরাটিলা গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ১৪ বছর গতকাল পূর্ণ হয়েছে। এলাকার মানুষ, দেশের খনিজ সম্পদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, দেশপ্রেমিক জনসাধারণ সকলেই বহুজাতিক কোম্পানি নাইকোর নিকট থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে সোচ্চার। বর্তমান সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর মামলাটি আমাদের অনুকূলে আছে। এখন এর চূড়ান্ত সমাধান টানা অতীব প্রয়োজন। একই সাথে টেংরাটিলা এলাকায় বহুমুখী ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃতি নিরূপণ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ; প্রভৃতি বিষয়ে একটি উঁচু পর্যায়ের কমিটির দ্বারা তদন্ত করানো আশু কর্তব্য। আমাদের জাতীয় সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে নিজেদের সামর্থ ও দক্ষতা বাড়িয়ে বহুজাতিক কোম্পানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনাও আরেকটি জরুরি কর্তব্য। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা যে দাবি জানিয়ে আসছেন ধারাবাহিকভাবে, তা আমলে নিতে হবে। নতুবা সম্পদ আমাদের, কিন্তু ভোগ করবে অন্যরা, আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখব আর মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকব। এমন নিদারুণ বাস্তবতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।