টেকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজ/ দুর্বৃত্ত ছাত্রদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হোক

বাদশা আলমগীর বাদশা থাকাবস্থায় নিজ শিক্ষকের (ওস্তাদ) পা ধুয়ে দিতেন পরম মমতায়। শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্ন আসলে আখছারই এই দৃষ্টান্তটি সামনে আনা হয়। বাদশাহি আমল বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে বেত এর ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু যুগ ও ব্যবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী পারষ্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ওৃ ¯েœহের সম্পর্ক এইসব পরিবর্তনের অনেক উর্দ্ধে থাকার কথা ছিলো। কিন্তু সময় এগিয়েছে। আমরা আধুনিক হয়েছি। আধুনিকতার সংজ্ঞা হলো সর্বোৎকৃষ্ট ইতিবাচক অবস্থা। এই সর্বোৎকৃষ্ট ইতিবাচক অবস্থার সময়ে এসে আমরা কী দেখছি? দেখছি শিক্ষার্থী শিক্ষককে পেটাচ্ছে। এমন কি খুন পর্যন্ত করে ফেলছে। আমাদেরই এই শহরে জয়ন্ত কুমার দে নামক এক শিক্ষককে জনৈক দুর্বিনীত শিক্ষার্থী ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। শিক্ষক পরিবার ওই হত্যাকা-ের বিচার পর্যন্ত পায়নি। শিক্ষক জয়ন্ত হত্যাকা-ের পর কয়েক দশক পেরিয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি উশৃঙ্খল অংশ এখনও নিজেদের সব ধরনের নিয়ম ও শৃঙ্খলার বাইরে ভাবছে। এরা শিক্ষাঙ্গনে ভর্তি হয় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নিজের মানসিক উৎকর্ষতা ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য নয়। বরং এরা ভর্তি হয় লোক দেখানোর জন্য, নিজেকে জাহির করার জন্য। এরা শ্রেণিকক্ষের কোনো শৃঙ্খলা মানতে রাজি নয়। শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষক কিছু বললেই এরা পাগলা ষাড়ের মতো ঘুতঘুত করা শুরু করে, অসভ্য ও বর্বর আচরণে অভ্যস্ত এরা। এই উশৃঙ্খল শিক্ষার্থীরা আজকের যুগে শিক্ষাঙ্গনের একটি বড় সংকট হিসাবে সামনে এসেছে।
গতকালের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ক্লাসে অমনোযোগী থাকায় তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আলী ইদ্রিসকে শাসন করেন শিক্ষক মোখলেসুর রহমান ও মুর্তজা আলী। ক্ষিপ্ত ছাত্র নামধারী অপগ- আলী ইদ্রিস পরদিন ওই দুই শিক্ষকের উপর শারীরিক হামলা চালায়। শিক্ষক দুইজনকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি করতে হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, দুর্বৃত্ত ছাত্র ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের আটক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
টেকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজে নামমাত্র বেতন কিংবা কোনো বেতন ছাড়াই প্রহৃত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান করে আসছেন। আক্ষেপ করে শিক্ষক মোখলেসুর রহমান সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, ‘২০১৪ সন থেকে বিনা বেতনে এই কলেজে শিক্ষকতা করে আসছি। বিনিময়ে ছাত্রের কাছ থেকে এই প্রতিদান পেয়েছি’। তাঁর এই আক্ষেপ আমাদের হৃদয়ের মর্মমূলে গিয়ে বিঁধে। আমাদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়ে আসে। প্রহৃত শিক্ষকদের নিকট ক্ষমা চাইবারও সাহস হারিয়ে ফেলি। এই বেদনার কিছুটা উপসম হতে পারে দুর্বৃত্ত ছাত্র ও তার সঙ্গী-সাথীদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা গেলে। তা কি হবে? নাকি স্থানীয়ভাবে যেনতেন প্রকারে বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য তথাকথিত কিছু সমাজপতির হস্তক্ষেপ ঘটবে?
শিক্ষার্থী নামধারী এইসব দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক ঘৃণা জাগ্রত না হলে এরা রেহাই পেয়ে যাবে। পারিবারিক প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষক নির্যাতন করে পার পেয়ে গেলে পরবর্তী জীবনে এরা অনেক বড় দুরাচারে পরিণত হবে, আমরা নিশ্চিত। টেকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজের ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষার্থীবৃন্দ ও অভিভাবকদের আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁরা কী করবেন। আমাদের আহ্বান থাকবে, ছাত্র নামের কলঙ্ক ওই আলী ইদ্রিসের আইনি বিচারের পাশাপাশি তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হোক। তাতে সমাজের ভিতর এই বোধ জাগ্রত হবে যে, শিক্ষকদের সাথে অসম্মান করলে এই সমাজ তাকে প্রশ্রয় দেয় না।