ট্রলির চালক যখন ৭ম শ্রেণির ছাত্র

বিন্দু তালুকদার
সোমবার বিকাল পৌনে ৩ টা, এই প্রতিবেদক সিএনজি যোগে তাহিরপুরের আনোয়ারপুর বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কারেন্টের বাজারে দ্রুত গতিতে ডিজেল ইঞ্জিনচালিত একটি ট্রলি বিকট শব্দে সিএনজিসহ আরো কয়েকটি ইজিবাইককে অতিক্রম করে।
কিন্তু দ্রুত গতিতে অতিক্রম করে যাওয়া ট্রলিটিতে চালকের আসনে বসা একটি শিশুকে দেখে সিএনজির চালকসহ সবাই অবাক হয়।
সিএনজির গতি বাড়িয়ে বেশ কয়েক মিনিট চেষ্টা করে স্থানীয় ইজিবাইক চালকদের সহায়তায় পলাশ ইউনিয়নের মুক্তিরগাঁও গ্রামের একটি সেতুর উপর ট্রলিটিকে থামানো হয়।
দেখা যায় তিনটি ভোজ্য তেলের ড্রাম পরিবহনকারী ওই ট্রলির চালকের আসনে বসা এক শিশু। শিশুটি জানায়, তার নাম হাকিম নূর রহমান, বয়স ১৩ বছর। পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল ছাত্র হাকিম আরো জানায়, বেশ দিন ধরেই এই ট্রলিটি চালায় সে। ভাল করেই ট্রলি চালাতে পারে। যখন স্কুল বন্ধ থাকে তখন মাঝে মাঝে চালায়। তার বাবাই নিয়মিত চালায় এটি।
শিশুর হাতে ট্রলির স্টিয়ারিং থাকলেও ট্রলির উপরে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায় বয়স্ক আরেক লোককে। পরে বয়স্ক লোকটি জানায় তিনি চালক হাকিম নূর রহমানের বাবা। তার নাম মো. হারুন রশিদ। তিনি ধনপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
বাবা ও ছেলের সাথে কথা বলার সময় জড়ো হয় কয়েকজন ইজিবাইক চালক। তখনও চালকের আসনে বসা ছিল স্কুল ছাত্র হাকিম। পরে উপস্থিত সবার অনুরোধে ছেলেকে চালকের আসন থেকে তোলে সেখানে নিজে বসেন হারুন রশিদ।
হারুন রশিদ এ সময় এই প্রতিবেদককে বলেন,‘ হাকিম নূর রেগুলার চালায় না। মাঝে মাঝে ইস্কুল বন্ধ থাকলে চালায়। ভুল হয়েছে আর দিব না তারে।’
এক ইজিবাইক চালক এসে হারুন রশিদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন,‘ ভাই আপনিত খুব বাদ মানুষ। বাপ অইয়া দুধের পুলারে ড্রাইভার বানাইচইন। তোমার পুলার বয়স অইছেনি ড্রাইভারির। এস্কিডেন্ট অইলে কিতা করবায়।’
উপজেলার পলাশগাঁও গ্রামের ইজিবাইক চালক মো. নজরুল ইসলাম বললেন,‘ এত কম বয়সে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা মোটেও সঠিক নয়। ছোট ছেলে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি।’
খোঁজ নিয়ে যায়, শুধু হারুন রশিদের ট্রলিই নয় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এধরনের অনেক গাড়ি ও ট্রলি প্রধান সড়ক দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে। এসব যানবাহন ও চালকের কোন ধরনের লাইসেন্স নেই, নেই কোন রোড পারমিট। থানার প্রধান গেটের সামনে দিয়ে উপজেলা সদরে দিন রাত চলাচল করলেও এসব অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে কোন পদক্ষেপ নেই। এসব ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ যান চলাচল বন্ধে ইতোপূর্বে উপজেলা সমন্বয় সভায় বেশ কয়েকবার আলোচনা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ধনপুর ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন,‘এসব বিপজ্জনক ও অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধের জন্য একাধিক বার উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়েছে, রেজুলেশনে এসেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। এসব যানবাহন বিকট শব্দ করে দ্রুত গতিতে চলে। এতে পরিবেশ দূষণ ও রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে। যে কোন সময় বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। ’
পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন,‘ স্কুল ছাত্ররা কোন গাড়ির চালক হতে পারে না। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে দেখব। তবে এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। ’
বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি মোল্লা মনির হোসেন বলেন,‘ যখন আমাদের নজরে পড়ে তখনই আমরা ব্যবস্থা নেই। ইতোপূর্বে একজন চালককে আটক করা হয়েছিল। তার অভিভাবক মুচলেকা দিয়েছেন।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমীর বিশ্বাস বলেন,‘কোন শিশুর হাতেই যানবাহনের চাবি দেয়া উচিত নয়। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’