ট্রাফিক সপ্তাহ হোক মূল্যবোধ গড়ে তোলার উপলক্ষ

সারা জেলায় এক দিনে অবৈধ যান ও চালকের বিরুদ্ধে ১৫৮ টি মামলা দায়ের, বিশেষ করে ট্রাফিক সপ্তাহের মতো একটি চলমান অভিযানে, যে সপ্তাহ শুরুর প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করেছে একটি ঐতিহাসিক কিশোর শিক্ষার্থী আন্দোলন; খুব বেশি নয় বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। গত রবিবার থেকে রীতিমত ঘোষণা দিয়ে সাড়ম্বরে দেশব্যাপী এই ট্রাফিক সপ্তাহ পালন শুরু করা হয়েছে। ট্রাফিক সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশের একটি চমৎকার ফেস্টুন আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। যে ফেস্টুনে লিখা রয়েছে-‘ভিআইপি, সিআইপি, আমলা/ সড়ক আইন ভাঙলেই মামলা’। একটি সফল অভিযানের জন্য এরকম মনোগ্রাহী শ্লোগান নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্টদের শৈল্পিক মনোবৃত্তি ও দৃঢ় সংকল্পবোধের বাহ্যিক পরিচয় বহন করে। এই শ্লোগান সত্যিকার অর্থে স্বার্থক হবে তখনই যখন বাস্তবে এর মমার্থ অনুধাবন করে মাঠে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়। এরকম একটি মহাসমারোহের ট্রাফিক সপ্তাহের ইতোমধ্যে চারদিন অতিবাহিত হয়েছে। এই চারদিনের প্রথম দিন ছিল পরিবহন ধর্মঘট। পরের তিন দিনে রাজধানীসহ সারা দেশে যথারীতি যানবাহন নেমেছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা কিছুটা কম দেখা গেলেও সড়কের শৃঙ্খলা আগের মতোই যথেচ্ছ অবস্থায় দেখা গেছে। একটি অভূতপূর্ব আন্দোলনের কোন প্রতিফলন সড়কে দেখা যাচ্ছে না এখনও। দৃশ্যত হঠাৎ করে আলাদীনের জাদুদ- স্পর্শের মতো পরিবর্তন আসবে না সত্য, কিন্তু সড়কে যদি এক ধরনের নিয়ম মানার অভ্যাস আমরা লক্ষ্য করতাম তাহলে সেটি হত স্বস্তির। দুঃখের বিষয় হলো, যানবাহন কিংবা পথচারী কারো মধ্যেই এরকম নিয়ম মানার অভ্যাস দেখা যায়নি। ফলে সপ্তাহ অবসানের সাথে ঘটা করে শুরু করা ট্রাফিক সপ্তাহেরও সমাপ্তি ঘটবে। এই বাংলাদেশে আবারও যাহা পূর্ব তাহা পরং অবস্থা চলতে থাকবে। একটি বিশাল ও অর্থবহ আন্দোলনের কোন ছাপই পড়বে না কারও মধ্যে?
শুরুতেই জেলার ট্রাফিক সপ্তাহের একদিনের কর্মতৎপরতার পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, যানবাহন চালক ও পথচারীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তার নিয়মগুলো পালনের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এই সচেতনতা তৈরি হলে আইন ভাঙার প্রবণতা এমনিতেই কমে আসবে। এই শহরে এখনও বহু ধরনের অবৈধ যানবাহন আছে। আছে অবৈধ চালকও। অন্যদিকে সড়কের অবস্থা বলে লাভ নেই। পথচারীরাও নিয়ম মানতে অভ্যস্ত নন। ট্রাফিক পুলিশ মূলত আইন ভাঙার অপরাধে সাজার দেয়ার পাশাপাশি জনসাধারণকে সম্পৃক্ত্ করে সড়ক নিরাপদ রাখার বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুললে কিছুটা কাজে আসত বটে। একদিনের লোক দেখানো সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে না এখানে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সড়কের নিয়ম মানাটি জাতির একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত করার বিষয় বুঝানো হচ্ছে। এটি একা ট্রাফিক বিভাগ বা বিআরটিএ’র কাজ নয়। এটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্বের অন্তর্গত। বলাবাহুল্য আমাদের দেশে এরকম সামাজিক জাগরণের বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। বরং বলা যেতে পারে চলমান বাস্তবতায় সর্বত্র সব ধরনের সামাজিকতা বা সামাজিক মূল্যবোধ-প্রথা ইত্যাদিও লোপ পেতে বসেছে। সুতরাং বলা দরকার ট্রাফিক সপ্তাহে যেন এই জাতির একটি ন্যূনতম মূল্যবোধ গড়ে উঠে।