ডলুরা শুল্কবন্দর নির্মাণে শম্বুক গতি পরিহার করা হোক

সরকারি নথির গতিকে শম্বুক গতির সাথে তুলনা করা হত একসময়। ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় এ ছিল উপমহাদেশীয় আভিজাত্য। যুগ পালটেছে। ঔপনিবেশিকতার নিগড় ছিঁড়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকে পরিণত হয়েছি। সেও প্রায় অর্ধশতক অতিক্রম করতে চলল। কিন্তু মৌলিকত্বের দিক থেকে আমলাতন্ত্রকে এখনও সেই অর্থে ঔপনিবেশিকতা মুক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। প্রয়াস ছিল সবসময়। ঐপনিবেশিক আমলাতন্ত্রকে স্বাধীন দেশের উপযোগী জনবান্ধব করে তোলার। সংস্কারের ছোঁয়া লেগেছে এর বহু জায়গায়। কিন্তু মূল কাঠামোটি খোলনলচে সমেত পালটানো সম্ভব হয়নি। ফলে জনসেবার জন্য প্রশাসনযন্ত্রকে প্রায়শই প্রশ্নের মুখোমুখী দাঁড় হতে হয়। জনস্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার অপরিহার্যতা থাকলেও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে তা হয়ে উঠে না অনেকক্ষেত্রে। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো জেলার ডলুরা শুল্কবন্দর স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা।
ভারত-বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য জেলার সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ডলুরায় একটি শুল্কবন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় প্রায় দুই বছর আগে। এই শুল্কবন্দর স্থাপন করা গেলে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বেশ জোরদার হয়। এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা গেলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায় উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য। হাওরের এই জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যে তেজি ভাব আনতে এই শুল্কবন্দরটি সহায়ক ভূমিকা রাখত। এই লক্ষ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ডলুরায় শুল্কবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমির ব্যবস্থা করতে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়। এই জমি চিহ্নিত করতেই মাঝখানে কেটে যায় দীর্ঘ দুইটি বছর। নানা পথপরিক্রমার পর অবশেষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ২৬ ডিসেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট জমি চিহ্নিত করে অনুমোদনের জন্য একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয় এবং অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে প্রার্থিত অনুমোদন না আসায় জমি অধিগ্রহণের পরবর্তী প্রক্রিয়া আর অগ্রসর হতে পারছে না।
ভূমি মন্ত্রণালয়ে দুই বা তিন সপ্তাহ আগে চিঠি পাঠিয়ে অনুমোদন পেতে সংগত কারণেই হয়ত আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত ও জমি চিহ্নিত করতে দুই বছরের মত সময় লেগে যাওয়া কোন অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। বিশেষ করে জেলার আর্থিক গতিপ্রবাহ বৃদ্ধি ও ব্যবসায় প্রসারের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এখানে আরও অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রার্থিত ছিল। এই সময়ক্ষেপণের বিষয়টিকেই ঔপনিবেশিক কাঠামোযুক্ত আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা যেতে পারে। যাহোক, আমরা দ্রুত বিষয়টির সুরাহা কামনা করছি। জমি অধিগ্রহণ কিংবা বন্দোবস্ত যাই হোক না কেন, অবিলম্বে শেষ করে শুল্কবন্দর স্থাপনের কাজ শুরু করার জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণের খরচ এখন বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি। ডলুরার যেখানে এখন প্রতি শতক জমি প্রায় ২৫ হাজার টাকা হারে মূল্য নির্ধারিত হয়েছে সেটিকে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অত্যধিক বলাটা অযৌক্তিক হবে না। হয়ত মূল্য নির্ধারণকারীরা বিধি-বিধান মেনেই এই মূল্য নির্ধারণ করেছেন। এ নিয়ে আমাদের কোন কথা নেই। আমরা চাই সবকিছু শেষ করে দ্রুত শুল্কবন্দরের নির্মাণ কাজ শুরু করা হোক।