ডাক্তারি রিপোর্টে ধর্ষণ গায়েব!

স্টাফ রিপোর্টার
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। গেল তিন মাসে ৩৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই সময় মাত্র একজনের ধর্ষণের আলামত পেয়েছে। বাকী ৩৮ জনের ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পায়নি কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগীরা এধরনের রিপোর্ট মানতে নারাজ। সার্টিফিকেট প্রদানকারীদের সমালোচনা করা হয়েছে ঘটনার প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর সোমবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৬ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষিতা শিশুটির রক্তাত পেন্ট ও জুতা উদ্ধার করেছে পুলিশ। যেখানে ছাপছাপ রক্ত লেগে আছে। ঘটনার রাতেই অভিযুক্ত ধর্ষক আব্দুল কাহারকে আটক করে পরের দিন আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।
প্রতিবেশিরা বললেন, ঘটনার পর শিশুটির প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। কিভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো প্রথমে বুঝতে পারে নি তারা। এজন্য ভিকটিমকে ভালো করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। তবুও কোথাও কাটার দাগ মিলেনি। পরে শিশুর মুখের ঘটনার বর্ণনা শুনে বুঝতে পারেন অভিভাবকরা। তখনও রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিলো না। একারণে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় শিশুকে।
ভিকটিমের প্রতিবেশি রাবেয়া খাতুন (ছদ্ম নাম) বললেন, ধর্ষকের ছেলের বউ প্রথমে শিশুটিকে নিয়ে আসে। এসময় শিশুটি ভয় পেয়ে যায়। তখনও ঘটনা বুঝতে পারেন নি কেউ। পরে ধর্ষকের ছেলের বউয়ের সহায়তায় শিশুটির শরীর পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। পরে ভিকটিমের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে তারা বুঝতে পারেন, কি হয়েছে তার সঙ্গে। পরে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে হাসপাতালের ডাক্তারি প্রতিবেদনে শিশুটির ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় নি জানিয়ে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। ভিকটিমের বাবা-মায়ের দাবি প্রতিবেদনে অনিয়ম করা হয়েছে। তারা ন্যায় বিচার চান।
ভিকটিমের বাবা বললেন, মেয়েকে ১২ সেপ্টেম্বর ভর্তি করি। হাসপাতাল ১৩ তারিখ আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। খুবই তারাতারি রিপোর্ট দিয়ে দেয় তারা। অনিয়ম করে রিপোর্টে তারা বলেছে, আমার মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয় নি। যা মিথ্যা। আমি ন্যায় বিচার চাই।
ভিকটিমের মা বললেন, হাসপাতাল মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়েছে। পাড়া প্রতিবেশিরা দেখেছেন বিষয়টি। আমার অবুঝ শিশুতো মিথ্যা বলবে না। রক্তাক্ত হাফ পেন্ট পুলিশের কাছে রয়েছে। তবুও কিভাবে তারা রিপোর্ট পাল্টে দিলো, সে বিচারও চাই আমরা।
শুধু এই ৬ বছরের নির্যাতিত শিশু নয়, গত ৩ মাসে ৩৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়ে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া ৩৮ জনের ধর্ষণের আলামত পায় নি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগ। ডাক্তারের দেওয়া এমন প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ।
জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বললেন, আমাদের সমাজে এই ধরণের ঘটনা প্রথমে প্রভাবশালীদের চাপে ধামাচাপার চেষ্টা করা হয়। থানা, হাসপাতাল পর্যায়ে আসতে চায় না ভোক্তভুগীরা। এই ৩ মাসে যারা এসেছেন তারা এমনিতেই আসেন নি। ন্যায় বিচার পাবার আশায় আইনের কাছে এসেছেন। এখন যারা থানায় এসেছেন, তাদের মামলা নিচ্ছে পুলিশ। কিন্তু হাসপাতাল ধর্ষণের আলামত পায় না। এতে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভোক্তভুগীরা। ৩৯ টির মধ্যে ৩৮ টির আলামত পাওয়া যায়নি, এতে প্রমাণ হয় এখানে বড় ধরণের অনিয়ম হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য্য বললেন, এই ধরণের ঘটনার পরে পরিবার ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ভিকটিমকে দোষারোপ করা হয়। আমরা চাই সমাজের এই ধরণের প্রবণতা কমাতে। যারা বিচারের জন্য আসে, তারা যেনো ন্যায় বিচার পান সেটিই আমরা চাই।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের গাইনী বিভাগের প্রধান ডা. লিপিকা দাস বললেন, ধর্ষণের ঘটনাগুলো হয়তো সত্য, ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সেভাবে আলামত না পাওয়ায় সেটি প্রমাণ করা যায় নি। পরীক্ষা নিরীক্ষায় তারা যা পেয়েছেন তাই তারা রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. সুমন মিয়া ৬ বছরের শিশুর রক্তাত হাফ পেন্ট ও জুতা সংগ্রহে আছে জানিয়ে বললেন, পহেলা জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ অভিযুক্তকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আনিছুর রহমান বললেন, জুলাই মাসে ১৪, আগস্টে ১৫ জন ভিকটিম হাসপাতালে এসেছে। তাদের কারোও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় নি। সেপ্টেম্বর মাসে (১৯ তারিখ পর্যন্ত) ১০ জন ভিকটিম হাসপাতালে এসেছেন। এদের মধ্যে একজনের ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তিনি জানালেন, সাজানো ধর্ষণ, সম্মতিক্রমে আলামত নষ্ট করে হাসপাতালে আসার কারণে ফলাফল নেগেটিভ আসে।