ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা সেবা দ্রুত কার্যকর হোক

জেলা প্রশাসন আয়োজিত ই-নামজারি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ আয়োজনের খবরটি আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটানো একটি জাতীয় আকাক্সক্ষা। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির আগমন ঘটার অন্তত চারটি দশক পেরিয়েছে। এরই মাঝে বেসরকারি খাতগুলো যেমনÑ ব্যাংক, বীমা, মোবাইল প্রোভাইডার, শিল্প-কারখানা বহুলাংশে ডিজিটাল হয়ে গেছে। এইসব প্রতিষ্ঠানে এখন আর কাগজে-কলমে ব্যবস্থাপনার চল্ দেখা যায় না। কিন্তু বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার যোজন যোজন দূর। বলা হয়ে থাকে, সরকারি খাতে বিরাজিত বিশাল পরিমাণ দুর্নীতি বজায় রাখার জন্যই কায়েমি গোষ্ঠী বিশেষ এই জায়গায় ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে অনাগ্রহী। এরকম একটি অবস্থায় যখন সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য একটি সেবাখাত জমি নামজারিকে ডিজিটাল করার প্রয়াসের খবর শোনা যায় তখন সেটি বিশেষভাবে আনন্দদায়ক সংবাদ হয়ে উঠে বৈকি। কে না জানে আমাদের দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত প্রতিটি সরকারি অফিস আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সে সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়ই বলুন কিংবা সাবরেজিস্ট্রি অফিসই বলুন নতুবা সেটেলম্যান্ট অফিসই বলুন। বাংলাদেশে কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও ভূমির মালিকানা রয়েছে এমন কোন ব্যক্তিকে এসব অফিসের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়নি সেরকম কোন নমুনা উদাহরণ দেয়ার জন্যও পাওয়া যাবে না। অথচ ভূমি ব্যবস্থাপনাটি ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরিত হলে এই জায়গায় দুর্নীতি রাতারাতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে আসবে। মূলত সরকারি খাতে সেবাদাতা ও গ্রহীতাকে সরাসরি যোগাযোগের অবস্থা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। ভূমি নামজারির সেবাকে ডিজিটাল করার সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা তাই যারপরনেই খুশি হয়েছি এবং কামনা করি অচিরেই এই ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা সেবাটি কার্যকর হোক।
বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় ঘোষণা দিয়ে, হুকুম জারি করে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। দুর্নীতি করার মত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে এরকম বাসনা করা আহাম্মকি মাত্র। যে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুবিধামত একটি সরকারি চাকুরি বাগিয়ে ফেললে চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য খুলে যায় সেখানে রাতারাতি সকলে সাধু পুরুষ বনে যাবেন না। এখানে ব্যবস্থাপনাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি কী জিনিস মোবাইল ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন তা বুঝতে পারেন। মোবাইল ব্যবহার করে গ্রামের একেবারে নিরক্ষর ব্যক্তিটিও নানা ধরনের কাজ সেরে ফেলতে পারেন। সুতরাং সেবাগ্রহীতারা তৈরি নয় বলে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যাচ্ছে না এমন যুক্তিও আদৌ ধুপে টিকে না। নামজারি, সেটেলম্যান্ট, পরচা পাওয়া, জমি রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি সবগুলো কাজই ডিজিটালি করা সহজসাধ্য বিষয়। যেখানে ব্যাংক বা মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের শতভাগ জটিল কাজ ইন্টারনেট আর কম্পিউটার ব্যবহার করে সমাধা করে ফেলতে পারে সেখানে উপরের সেবাগুলো তো নস্যি মাত্র। আসল কাজ হলো, সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে এটুআই (এক্সেস টু ইনফরমেশন) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। কিন্তু এই প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত কাজের কোন সুফল গ্রামের সাধারণ মানুষটি কমই পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছে যে প্রকল্পের সুফল পৌঁছায় না তার বাস্তব উপযোগিতা নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। আপাতত আমরা সেই সমালোচনায় না গিয়ে কায়মনোবাক্যে কামনা করি সরকারি কাজগুলোকে ই-ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসার কর্মযজ্ঞ তরান্বিত হোক।