ডুংরিয়ায় নারী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

মহিলাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ডুংরিয়া গ্রামে নিজের বাসভবনের দেড় বিঘা জমি সরকারের অনুকূলে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এক সময় ছিল, যখন নানা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত আনুকূল্যে গড়ে উঠত। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি বিশেষের এমন সামাজিক উদ্যোগ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এখন সবকিছুর জন্যই সরকারের মুখাপেক্ষী থাকার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সামাজিক কর্মকা-ে সম্পন্ন ব্যক্তিদের আগ্রহের ঘাটতি থেকে বুঝা যায় আমরা ক্রমশ ব্যক্তি খোলশের ভিতরে আটকে পড়ছি। মানুষের নিজের পরিবার ছাড়াও যে তার পৃথক একটি সামাজিক সত্তা রয়েছে এবং সেই জায়গায় তাঁর দায়বদ্ধতাও আছে সেটি আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি। বরং এখন সকলেই মুখিয়ে থাকেন কোন উপায়ে নিজের বিত্ত ও সম্পদ আরও বাড়ানো যায়। সামাজিক অনুদারতার এমন এক সময়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান নিজের বাড়ির জায়গা জনহিতকর কাজে দান করে আমাদের সেই পুরোনো সামাজিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। তাঁকে ধন্যবাদ।
মন্ত্রীর দান করা জায়গায় নারীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে গেলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় তিনি আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানে একটি স্বতন্ত্র নারী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়ে গেছেন। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে জানিয়ে তিনি এখানে নারীদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দান বিশেষ করে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে ট্রেড নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি হবে আবাসিক। প্রায় ১০০ নারী এখানে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করলে এলাকার দারিদ্র নারীরা যে এখানে এসে কিছু আয়বর্ধন কর্মকা-ের দক্ষতা অর্জন করে অর্থ উপার্জনের পথ খোঁজে পাবেন সেটি বেশ ভাল করে বুঝা যায়।
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী সমাজকে উপেক্ষা করে জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নারীরা এখন আর ঘরের গৃহিনীই কেবল নয়। তারা এখন পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকা-েও সম্পৃক্ত হচ্ছে। নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যত তাড়াতাড়ি আসবে তত তাড়াতাড়ি ঘুচবে নারী-পুরুষ বৈষম্য। নারী যতটা পরাধীন বা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত তার অন্যতম কারণ হলো নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাব। রাষ্ট্র এই জায়গায় কয়েক দশক ধরে কাজ করছে। তার ফলাফলও আমরা পাচ্ছি। গার্মেন্টস সেক্টরের ৯০ ভাগ কর্মীই নারী। নারীরা এখন যেমন বিমান পরিচালনা করতে পারেন তেমনি দক্ষ হাতে প্রশাসনও পরিচালনা করতে পারছেন। আবার এই নারীরাই প্রতিরক্ষা কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছোট-বড় পড়ে বসে সমান কুশলতা দেখাচ্ছেন। নারীদের এই অগ্রগতিকে আরও বেগবান করতে হবে। অগ্রগতির এই অভিযাত্রায় ডুংরিয়ার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবে আরেকটি পথপ্রদর্শক। আমরা চাই এখানে গতানুগতিক ধারণার বাইরে যেয়ে এমন কিছু ট্রেড নির্ধারণের যার স্থানীয় উপযোগিতা রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় আকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার সুযোগ রয়েছে এমন বিষয়ে দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরির উপযুক্ত ট্রেড নির্ধারণ করা। সুনামগঞ্জের সম্পদ ধান, মাছ, বালু ও পাথর, জনশক্তি এবং পানি; এই সম্পদগুলোকে উপজীব্য করে কী ধরনের শিল্প গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে পরিণত করতে সৃজনশীল উদ্যোক্তা খোঁজার কাজটিও একই সাথে চালু রাখতে হবে। তাহলে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি সর্বার্থে সুনামগঞ্জের জন্য হয়ে উঠবে আশীর্বাদস্বরূপ।