ঢাকা থেকে নিখোঁজ সাংবাদিক মুশফিককে সুনামগঞ্জে পাওয়া গেছে

স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে শনিবার নিখোঁজ হওয়া মোহনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মুশফিকুর রহমানকে সুনামগঞ্জে পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার ভোরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের গোবিন্দপুর এলাকায় তাকে পাওয়া যায়। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক মুশফিকুর মনে করছেন, ‘কুমিল্লার দাউদকান্দি’র একটি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন পরিকল্পিতভাবে তাকে মেরে ফেলার জন্য এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। গত ২২ জুলাইয়ে মুঠোফোনে তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।’
পুলিশ জানায়, মুশফিকুর রহমান ভোরে সুনামগঞ্জ শহরতলির গোবিন্দপুর এলাকার মসজিদের সামনে যান। সেখানে থাকা এক মুসল্লি’র কাছে তিনি কোথায় আছেন জানতে চান। এরপর তাঁর পরিচয় দেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা মোহনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি কুলেন্দু শেখর দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তিনি পুলিশ নিয়ে গিয়ে মুশফিককে উদ্ধার করে হাসাপাতালে নিয়ে আসেন।
গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী ফুয়াদ মনি জানান, স্থানীয় লোকজন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তাকে খবর দেন। তিনি সেখানে যাবার পর মুশফিক তার পরিচয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ফুয়াদ পরে মুঠোফোনে মুশফিককে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনি খুবই ক্লান্ত ছিলেন। তার চোখ-মুখ ফুলা ছিল। এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে মুসল্লিরা তাকে মসজিদের ভিতর নিয়ে যান।
সদর হাসপাতালে মুশফিকুর রহমান জানান, তিনি কিভাবে এখানে এসেছেন কিছুই জানেন না। শনিবার গুলশান এলাকায় তার চোখে কোনো কিছু ছিটানো হয়। এরপর তিনি শুধু হেঁটেছেন মনে হয়েছে। এক পর্যায়ে তিনি আর কোনো কিছু বুঝতে পারেননি। যখন জ্ঞান ফিরে তখন বুঝেন চোখ, হাত বাঁধা। একটি গাড়িতে কয়েকজন লোক ছিল। তিনি তাকে কেন ধরে আনা হয়েছে জানতে চান। ওই লোকজন তাকে মেরে ফেলার কথা বলে। এক সময় একটি বড় গেটের ভেতর দিয়ে ওই গাড়ি ঢুকেছে কেবল খেয়াল করেছেন তিনি। ওই সময় দৃর্বত্তরা বলছিল, গুলি করে মারলেও ছটপট করে মরে যাবে, গলা কেটে মারলে গলা আলাদা করে ফেলে দিলে পদ্মা সেতু’র জন্য গলা কেটে নিয়ে গেছে বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। বস্তার মধ্যে লাশ ঢুকিয়ে ইট ঢুকিয়ে নদীতেও ফেলে দেওয়া যেতে পারে। দৃর্বৃত্তরা এই তিনদিন তাকে শুধু একটি কেক ও কিছু পেয়ারা খেতে দিয়েছিল। কিলঘুষি এবং শরীরের উপরে ওঠে পা দিয়ে মাড়িয়েছে ২-৩ জন মিলে। তিনি জানান, ভাত খেতে চাইলে তাকে মারধর করা হয়। তাকে কয়েকবার মারধর করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কেন তাকে ধরে নেওয়া হয়েছে সেটি ওই লোকজন বলেনি। গাড়িতে দুর্বৃত্তরা নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় ইয়াছিন ও সাজ্জাদ নাম উচ্চারণ করেছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জে কিভাবে এলেন কিছুই বুঝতে পারেন নি তিনি। গাড়ি থেকে নামানোর পর তাকে বলা হয়েছে দৌঁড় দিতে। থামলে পেছন দিকে গুলি করা হবে। এরপর তিনি কমপক্ষে ২ কিলোমিটার দৌঁড়াতে থাকেন।
মুশফিক বলেন, আমার ধারণা আমার গ্রামের বাড়ি’র একটি স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এর আগেও এরা একটি মুঠোফোন নম্বর থেকে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ওই মোবাইল নম্বর সহ গত ২২ জুলাই রাজধানী’র পল্লবী থানায় জিডি করেছি আমি (জিডি নম্বর ১৯৪)।
তিনি জানালেন, মাসখানেক আগে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার চরগোয়ালিতে খন্দকার নাজির আহমেদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তার। তিনি বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর বঙ্গবন্ধুর খুনী খন্দকার মোস্তাক আহমেদের ভাইয়ের নামে নামকরণ করা খন্দকার নাজির আহমেদ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক আত্মসাৎকৃত দেড় লাখ টাকাও তিনি এই সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে স্কুলের হিসাবে জমা করেছেন। এসব কারণে একটি পক্ষ তার উপর ক্ষিপ্ত, তারা নিজেরা অথবা ভাড়াটে খুনী দিয়ে এই কাজ করাতে পারে।
সাংবাদিক মুশফিকুর রহমান দাবি করলেন, তাকে মুঠোফোনে হুমকি দাতাকে খুঁজে বের করলেই এই রহস্য বেরিয়ে আসবে।
জানতে চাইলে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, খন্দকার নাজির আহমেদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি নিয়ে সাংবাদিক মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে কারো দ্বন্দ্ব বা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। মুশফিকুর রহমান সুস্থ হয়ে ফিরলে তার কাছ থেকে জেনে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
হাসপাতালের চিকিৎসক নাসির উদ্দিন জানান, মুশফিকের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন না থাকলেও তাকে বেশ মারধর করা হয়েছে। ব্যথা আছে। চোখে কোনো কিছু দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তিনি ঝাপসা দেখছেন। তবে বিশ্রাম নিলে এসব ঠিক হয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, আমরা ঢাকায় তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ঢাকা থেকে লোকজন আসছেন। তারা এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন তিনি হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন আছেন।
সাংবাদিক মুশফিকুর রহমান ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে গত শনিবার নিখোঁজ হন। তিনি ঢাকার মিরপুরে থাকতেন। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার চরগোয়ালি গ্রামে বাড়ি তার।
এদিকে, দুপুরে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক মুশফিকুর রহমানকে দেখতে যান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত।